বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

কওমি মাদরাসায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শায়খ আহমাদুল্লাহর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুলাই ৩১, ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম

কওমি মাদরাসায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শায়খ আহমাদুল্লাহর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা

ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনন গঠনে কওমি মাদরাসার ভূমিকা অনস্বীকার্য। যুগ যুগ ধরে এই শিক্ষাব্যবস্থা এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ধর্মীয় শিক্ষার আলো ও নৈতিক মূল্যবোধের চেতনা ছড়িয়ে আসছে এবং সৎ, নীতিবান ও আদর্শ নাগরিক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কওমি মাদরাসা কেবল কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি এ দেশের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক নিরাপত্তাবলয় হিসেবে কাজ করছে।

রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদান বা বাজেট ছাড়াই সম্পূর্ণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানার মাধ্যমে লাখ লাখ এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিশু-কিশোর ও যুবকের অন্ন, বস্ত্র, আবাসন ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ দ্বিনি শিক্ষা লাভ করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রও এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা থেকে মুক্ত হচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আবাসিক মাদরাসাগুলোতে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কিছু অপ্রীতিকর খবর সামনে আসছে।

দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদরাসাগুলোতে মাঝেমধ্যে শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ, শারীরিক প্রহার এবং অত্যন্ত ঘৃণ্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ইসলামী শরিয়ায় শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। অননুমোদিত যৌনাচার এবং সমকামিতাকে ইসলামে কবিরা গুনাহ ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তদুপরি কিছুসংখ্যক তথাকথিত শিক্ষকের মাধ্যমে এহেন ইসলাম ও নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়া যুগপৎ অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক।

অতএব ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি রক্ষা, জনসাধারণের আস্থা অটুট রাখা এবং কোমলমতি শিশুদের একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার জন্য বর্তমান সময়ের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে সবচেয়ে বড় দাবি। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, মাদরাসাশিক্ষিতরাও মানুষ এবং তারা ফেরেশতাদের মতো ভুলের ঊর্ধ্বে নন। মানবীয় কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তির তাড়না তাদেরও রয়েছে এবং সমাজের অন্য সব শ্রেণির মতো এদের কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তাদেরও প্রাপ্য।

এই সংকটের অপর পিঠে রয়েছে এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও একপেশে অপপ্রচারের বাস্তবত্ব। কোনো ইসলামী লেবাসধারী ব্যক্তির নেতিবাচক খবর পেলেই প্রচারমাধ্যমগুলো সত্যের সঙ্গে মিথ্যার রং মিশিয়ে তা বিশাল আকারে প্রচার করে থাকে। ব্যক্তিবিশেষের অপরাধকে গোষ্ঠীবিশেষের ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টাও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। বিপরীতে মাদরাসাসংক্রান্ত ইতিবাচক সংবাদ প্রচারে তাদের এতটা আগ্রহী দেখা যায় না। এমনকি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে নিরীহ আলেম ও ইমামদের ফাঁসানোর ঘটনাও অতীতে ঘটেছে।

অনেক সময় পুরনো মীমাংসিত ঘটনাও নতুন করে একযোগে বাজারে ছাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তবে এটি স্বীকার্য যে সব সংবাদই মিথ্যা নয়। সুতরাং মিডিয়ার অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। আমরা যদি এখনই এই মুষ্টিমেয় নামধারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হই এবং কঠোর আত্মসংশোধনের পথে না হাঁটি, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হবে। এতে মাদরাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক দ্বিনি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।

দ্বিনের এই অপরাজেয় দুর্গগুলোকে সুরক্ষার স্বার্থে নেতৃত্বস্থানীয় উলামায়ে কেরামের সমীপে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা পেশ করেছেন প্রখ্যাত আলেম শায়খ আহমাদুল্লাহ। আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শীর্ষ আলেম, আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে গুরুতর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠা মাত্রই এই কমিটি দ্রুত সরেজমিনে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে। অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করার সুপারিশ করা হবে।

পাশাপাশি অভিযুক্তের নাম-পরিচয় দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কালো তালিকা তৈরি করতে হবে, যাতে সে আর কখনো দেশের কোনো মাদরাসায় চাকরি না পায়। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংবাদ সম্মেলন করে তা দৃঢ়তার সঙ্গে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। এর মাধ্যমে অপরাধী শাস্তি পাবে, আর নিরপরাধ ব্যক্তি মিথ্যা অভিযোগের বোঝা থেকে মুক্ত হবে। সামগ্রিকভাবে এ কাজটি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হাইয়াতুল উলয়া কর্তৃক একটি অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠন করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এই সেলের মাধ্যমে ভিকটিমরা হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবে এবং সেখানে অভিযোগকারীর পরিচয় ও তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করা হবে। এই সেল ভিকটিমের পরিবারকে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করবে এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটির কাছে প্রতিবেদন পেশ করে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে সুপারিশ করবে।

প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে মাদরাসার ক্লাসরুম, বারান্দা এবং বিশেষ করে নুরানি, হিফজ ও আবাসিক বিভাগগুলোকে সম্পূর্ণ সিসি ক্যামেরার আওতায় এনে সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুদের অনাবাসিক হিসেবে শিক্ষাদানের চেষ্টা করতে হবে। অতি অল্প বয়সে মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আবাসনে থাকার ফলে শিশুরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে, যা তাদের নানা রকম নিপীড়নের ঝুঁকিতে ফেলে।

আবাসন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে আবাসিক মাদরাসায় প্রচলিত ঢালাও বিছানা বা গণরুমের পদ্ধতির ক্ষেত্রে বিছানাগুলো একেবারে গায়ে গায়ে না রেখে দুই বিছানার মধ্যে ন্যূনতম এক হাত পরিমাণ ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা ধীরে ধীরে পৃথক খাট বা কমপক্ষে স্বল্প খরচে চৌকির ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনোরূপ শারীরিক সেবা নিতে পারবেন না এবং এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিক্ষক ও স্টাফদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ সম্পর্কিত একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আচরণ নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকদের জন্য পেশাগত ও আচরণগত নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে শিশু মনস্তত্ত্ব, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইসলামসমর্থিত স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং শিশু সুরক্ষা আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে তাদের সচেতন ও সংবেদনশীল করে তুলতে হবে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাগত ও নৈতিক যোগ্যতার পাশাপাশি বিবাহিত হওয়া এবং পরিপক্ব বয়সের শর্তারোপ করা উচিত। বিশেষ করে নুরানি, হিফজ এবং প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অপরিণত তরুণদের দায়িত্ব না দিয়ে অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকদের জন্য মাদরাসার ব্যবস্থাপনায় সপরিবারে থাকার পারিবারিক কোয়ার্টারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা এবং নিয়মিত যৌক্তিক ছুটির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক জীবন স্বাভাবিক থাকে।

নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতির ক্ষেত্রে বালিকা বা মহিলা মাদরাসায় অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো সম্পূর্ণ নারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে এবং কেবল প্রধান ফটকে প্রহরী ও বাইরের কাজ তদারকির জন্য বয়স্ক পুরুষ রাখা যেতে পারে। অভিভাবক বা বহিরাগতদের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ও লেনদেন নারী স্টাফদের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত। বালিকা মাদরাসা যথাসম্ভব অনাবাসিক রাখার চেষ্টা করতে হবে এবং আবাসিক মাদরাসার ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সবশেষে দেশের আনাচে-কানাচে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মানহীন প্রাইভেট মাদরাসাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মতন্ত্রের মধ্যে নিয়ে আসার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যত্রতত্র মানহীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সামগ্রিকভাবে মাদরাসা শিক্ষার মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। সব ধরনের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। এর মাধ্যমে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও সুসংগঠিত, কার্যকর ও মানসম্মত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।