মার্চ ৩০, ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে তৈরি হওয়া তীব্র চাপ সামাল দিতে সরকার একগুচ্ছ সাশ্রয়ী পদক্ষেপ বা কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এখন সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, কর্মকর্তাদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ এবং অফিসের বর্তমান সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস পুনরায় চালু করার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের সব সরকারি সংস্থাকে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা তৈরি করতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব প্রস্তাবনা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মূলত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীলতা বিবেচনায় নিয়ে আপাতত তিন মাসের একটি স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সরকার মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলে যাওয়ার প্রস্তুতিও রাখছে।বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম, আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ এবং ডলার সংকটের কারণে সরকার এই কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় থাকা আটটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হলো সাপ্তাহিক ছুটিতে আরও একদিন যোগ করা অথবা কর্মকর্তাদের সপ্তাহে অন্তত দুদিন ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
এ ছাড়া অফিসের কাজ সকালে দ্রুত শুরু করা অথবা দৈনিক কাজের মোট সময় কমিয়ে আনার মতো বিকল্পগুলোও টেবিলে রয়েছে। বিদ্যুৎ খরচ ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিন অনলাইনে পাঠদানের প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতেও বিশেষ নজর দিচ্ছে প্রশাসন। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ঋণ পরিহার করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাবও চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে।
তবে তেলের দাম বাড়ানোর মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সরকার এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে চাচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিদ্যমান স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপের বাইরেও কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছে।এদিকে জ্বালানি মজুত রোধে সরকার নজরদারি জোরদার করেছে। এমনকি তেলের অবৈধ মজুতকারীকে ধরিয়ে দিতে পারলে এক লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গতকালই সব সরকারি অফিসে দিনের বেলা প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহারের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়মগুলো তদারকি করতে প্রতিটি দপ্তরে বিশেষ ‘ভিজিল্যান্স টিম’ গঠন করার কথা জানানো হয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এই সংকটের আঁচ সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পেট্রোবাংলা আগামী মাসগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে বলে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ খাত এখন ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল বিকল্পের ওপর নির্ভর করছে। এই সংকটের মুহূর্তে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন