মে ২৭, ২০২৬, ১০:২৮ এএম
বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশের বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। রাজনৈতিক মেরূকরণের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গভীর সামাজিক বিভাজনের মধ্যে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি।
নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট এবং জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির মতো অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জগুলো এই ১০০ দিনে সরকারের মূল পরীক্ষার কেন্দ্রে ছিল।
এখন সরকার মূল্যায়নের সময়।
বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মাত্র ১০০ দিনে নিরূপণ করা কঠিন। তবে এই সময়ে সরকার কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের পথে হাঁটলেও অনেক খাত এখনো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরণ এবং তার প্রভাব নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
সরকারের সামনে এখন কাঠামোগত সংস্কারের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই ছিল এই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচনি ইশতেহারের মূল অংশ। কিন্তু বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতো অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আসন্ন বাজেটেই সরকারের প্রকৃত অগ্রাধিকার ফুটে উঠবে। সরকারের দাবি, মন্ত্রিসভায় নেওয়া ৬০টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ৬২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি খাতে কৃষক কার্ডের মতো নতুন প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
তবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এখনো আশানুরূপ নয়।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ না হওয়ায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভর্তুকি প্রদানের সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারই এখন একমাত্র পথ। সরকারের পক্ষ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হলেও, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন এখনো কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছায়নি।
পুলিশের পেশাদারিত্বের অভাব এবং মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণহীনতার চিত্র প্রায়ই গণমাধ্যমে উঠে আসছে। মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো জনমনে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলছেন, পেশাদারিত্বের জায়গায় পুলিশ এখনো ফিরতে পারেনি, যা নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় জনআস্থার সংকট তৈরি করছে। যদিও সরকার মব ভায়োলেন্স রোধে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তবুও ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের সফলতা নিয়ে জনমনে অস্বস্তি কাটছে না।
র্যাবের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সরকার এখন নতুন চিন্তাভাবনা করছে।
রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সরকার নানা কৌশলের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। সংসদের অধিবেশনে জুলাই সনদ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধী দলগুলো সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান মনে করেন, সরকার সংঘাত এড়িয়ে বিরোধী দলের সাথে আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির বিষয়টি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জটিলতার কারণ হতে পারে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, যাকে অনেকে রাজনৈতিক চাল হিসেবেও দেখছেন।
হাম প্রাদুর্ভাব সরকারের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক পরীক্ষা।
হঠাৎ করে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারের জরুরি বরাদ্দ ও টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
আগামী দিনগুলো সরকারের জন্য আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
সঠিক অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং রাজনৈতিক সংহতি ধরে রাখতে পারলে সরকার হয়তো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন