বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে কতদিন লাগবে

জাতীয় ডেস্ক

জুলাই ৩১, ২০২৬, ১০:৫৬ এএম

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে কতদিন লাগবে

ছবি : সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারাগারে বন্দি থাকা সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে দেশটির সরকার নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ইন্টারপোল রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাইয়ে আটকের পর মামলাগুলোর প্রাথমিক নথিপত্র পর্যালোচনার কাজ চলছে।দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে দুবাইয়ে বন্দি আছেন সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা।

যেসব মামলার কারণে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রাথমিক নথিপত্র পর্যালোচনার পর ঢাকার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করেছে দুবাই পুলিশ। এই দফায় বন্দি প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি বিষয় সম্পর্কিত আরও বেশকিছু তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলাগুলো যেহেতু দুর্নীতি দমন কমিশন দেখছে, সেজন্য তাদের তদন্তকারী কর্মকর্তারাই তথ্য-উপাত্তগুলো প্রস্তুতের কাজ করছেন।

দুবাই পুলিশের চাওয়া যাবতীয় নথিপত্র সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইন্টারপোল হয়ে নথিপত্রগুলো দ্রুতই দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নথিপত্র ঠিকঠাকমতো সরবরাহ করার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা গেলে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফেরানো খুব একটা কঠিন হবে না। তবে আইনি সব প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে বাংলাদেশে ফেরাতে ঠিক কতদিন লাগতে পারে, তা নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি দেশের মধ্যে অপরাধী হস্তান্তরের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করা। কিন্তু ভারত ও থাইল্যান্ড ব্যতীত অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এমন কোনো চুক্তি নেই। ফলে দুর্নীতিসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে কোন প্রক্রিয়ায় ঢাকায় ফেরত আনা হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি মূলত অপরাধের বিষয়ে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, দুই দেশের আইনের সামঞ্জস্যতা, আদালতে তথ্য উপস্থাপন এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওলোরা আফরিন জানিয়েছেন, এই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই সে দেশের আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তদন্ত শুরু হলে ২০২৪ সালে দেশ ছেড়ে দুবাই চলে যান বেনজীর আহমেদ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গত বারো জুন দুবাইয়ের একটি শপিংমল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ।

বর্তমানে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ তার বিরুদ্ধে অর্ধ ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং অপর আরেকটি মামলার বিচারকাজ চলছে। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তারির পর প্রথম দফায় দুবাই পুলিশের কাছে একান্ন পৃষ্ঠার নথিপত্র পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। দ্বিতীয় দফায় প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আরও তথ্য-উপাত্ত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

তবে সাবেক এই আইজিপিকে দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে কিছু আইনি ও কারিগরি চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ বিনিয়োগসূত্রে তুরস্কের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তিনি যদি দুবাইয়ে বৈধভাবে বসবাসকারী হন এবং সেখানে নতুন কোনো অপরাধের অভিযোগ না থাকে, তবে তার আইনজীবীরা এই যুক্তি তুলে ধরতে পারেন। অতীতেও ভিন্ন দেশের পাসপোর্ট থাকার কারণে অনেক পলাতক অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য আশাবাদী যে প্রক্রিয়াটি খুব জটিল হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জানিয়েছেন, চুক্তি থাকুক বা না থাকুক জাতিসংঘের সনদ অনুসারে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে অতীতেও আসামি আদান-প্রদান করা হয়েছে। ফলে আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতা সফল হলে তাকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সিকিউরিটি কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট এবং অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ট্রান্সফার অব সেনটেন্সড পারসনস নামে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তি রয়েছে। অতীতেও এই চুক্তির আওতায় কয়েকজন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সবেমাত্র শুরু হলো বিধায় নির্দিষ্ট করে সময় বলা সম্ভব নয়। তবে সব আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করে সাবেক এই আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।