রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

এক দফা দাবি ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে বদলে যায় দেশের রাজনীতি

জাতীয় ডেস্ক

আগস্ট ৩, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

এক দফা দাবি ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে বদলে যায় দেশের রাজনীতি

ছবি : সংগৃহীত

আজ ৩ আগস্ট। ঠিক দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে বদলে গিয়েছিল দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল ছাত্র-জনতার সমাবেশ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারা দেশ থেকে আসা হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আসে।

সেদিন বিকেল ৫টার দিকে এই ঘোষণা দেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম।এর আগে সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে এক বৈঠকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি সংঘাত চান না বলে জানালেও, শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে সেই সংলাপের আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। শুধু প্রধানমন্ত্রীর নয়, সম্পূর্ণ মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পাশাপাশি আন্দোলন চলাকালে সব হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের বিচারের দাবি তোলা হয় সেদিন। নেতারা জানান, তারা এমন এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে চান যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের উত্থান সম্ভব হবে না।

পরদিন ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।এই অসহযোগ কর্মসূচি সফল করতে ১৫ দফার একটি বিস্তারিত রূপরেখা ঘোষণা করেন আরেক সমন্বয়কারী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। নাগরিকরা সরকারকে কোনো কর বা ইউটিলিটি বিল দেবেন না, সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত ও তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ থাকবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পাশাপাশি প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে এবং বন্দরশ্রমিকরা পণ্য খালাস করবেন না বলে জানানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শুধু থানায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করবেন এবং কোনো বিক্ষোভ দমনে অংশ নেবেন না বলে ১৫ দফায় উল্লেখ করা হয়।

বিকেল গড়ালে রাজু ভাস্কর্যের চোখ লাল কাপড়ে বেঁধে দেন বিক্ষোভকারীরা।সন্ধ্যা ৭টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করা হয়। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও মিরপুর রোডসহ ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে হাজারো মানুষের পাশাপাশি ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সমাবেশ করেন।

ঢাকার বাইরে সারা দেশেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বিপিএটিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সাভার মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সিলেট, কুমিল্লা, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার খবর আসে। গাজীপুরে অন্তত একজন নিহত হন। কুমিল্লায় রেসকোর্স এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। বগুড়ায় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেটে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সাতমাথা ও সার্কিট হাউজ এলাকা, যেখানে ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন।

চট্টগ্রামে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনে হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।একই দিন বিকেলে চট্টগ্রামের আরেক সংসদ সদস্যের লালখান বাজারের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। অন্যদিকে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহতের ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাংবাদিক নিহতের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করে সাংবাদিক ইউনিয়ন। পরিস্থিতি নিয়ে সেদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেছিলেন, এটি আর ছাত্রদের আন্দোলন নেই।

তবে একই দিনে সেনাসদর দপ্তরে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, সেনাবাহিনী দেশের জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক এবং তারা সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।এর ঠিক আগের দিন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্রের অবনতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন।