অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম
জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের যেকোনো গঠনমূলক পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সংলাপটির শিরোনাম ছিল ‘প্যারিস থেকে আন্তালিয়া: প্রকৃতির জন্য জলবায়ু অর্থায়নের পর্যালোচনা’।
মন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি টেকসই জাতীয় নীতি প্রণয়ন করতে চায়, যা প্রকৃতপক্ষে দেশের সাধারণ মানুষের স্থায়ী কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। বক্তব্যে তিনি গত তিন দশকে বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের চরম ধীরগতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে দেশীয় পরিবেশবিজ্ঞানী, জলবায়ু গবেষক, সরকারের নীতিপ্রণেতা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে ৩৫ বছর আগে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পরিবেশ বিষয়ক নিজের প্রদত্ত ভাষণের স্মৃতিচারণ করেন ড. মঈন খান।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, ৩৫ বছর আগে আমরা জাতিসংঘে যেসব পরিবেশগত শঙ্কা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছিলাম, আজও আমরা সেই একই কথাই পুনর্ব্যক্ত করছি।’ দূষণকারী দেশগুলো পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ দেবে—এমন যে মৌলিক নীতিমালাগুলো তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়েছিল, তা আজ বিশ্বজুড়ে মীমাংসাহীন রয়ে গেছে। বিশ্বের সিংহভাগ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী ধনী রাষ্ট্রগুলো ঐতিহাসিকভাবে তাদের ওপর বর্তানো দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে, যার ফলে পুরো বৈশ্বিক বাস্তুসংস্থান ক্রমাগত চরম সংকটের মুখে পড়ছে।
উন্নয়নশীল দেশের জনপ্রতিনিধিদের বাস্তবমুখী জটিল চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ দ্রুত দৃশ্যমান অবকাঠামো, পাকা রাস্তাঘাট ও শিল্পায়নের বিকাশ দেখতে চায়। কিন্তু জননেতাদের এই স্বল্পমেয়াদি চাহিদার সাথে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত টেকসই রূপরেখার একটি ভারসাম্য বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক ও উন্মুক্ত মনোভাব এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য শিক্ষণীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ঋণ ও জলবায়ু তহবিলের জটিল সমীকরণ নিয়ে নিজের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন ড. মঈন খান।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিদেশি ঋণ গ্রহণ নিজে কোনো সমস্যা বা সংকট নয়, আসল প্রশ্ন হলো সেই ঋণের অর্থ কোন খাতে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘ বছর ধরে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বহু অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ পরিচালনা করলেও আন্তর্জাতিক ঋণভারে জর্জরিত দরিদ্র দেশের তালিকায় কখনোই পড়েনি বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বাংলাদেশ তার নিয়মিত ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সফলভাবে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এর মূল কারণ দেশের অত্যন্ত শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেশের মোট জাতীয় অর্থনীতির প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত, যা কোটি কোটি মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রাকে ভেতর থেকে টিকিয়ে রেখেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে পশ্চিম জার্মানির পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সঠিক ও উৎপাদনশীল খাতে স্বচ্ছতার সাথে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ঋণ নিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিচালনা একটি দূরদর্শী ও ইতিবাচক কৌশল হতে পারে।
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি নেপালের একটি ঐতিহাসিক পরিবেশ আন্দোলনের উদাহরণ টানেন, যেখানে সচেতন জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ একটি পরিবেশবিনাশী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিহত করে স্থানীয় প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পেরেছিল।
একই সঙ্গে তিনি জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী ও পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কেবল বিলাসবহুল হোটেলের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে সীমাবদ্ধ না থেকে তৃণমূলের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে বাস্তবসম্মত প্রচারণা চালানোর উদাত্ত আহ্বান জানান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন