অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকারের পরিসর উন্মুক্ত করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। জুলাই সনদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থবিল, আস্থা ও অনাস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো জরুরি চারটি ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে অবস্থান ও ভোট দিতে পারবেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির নবম বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
সংসদ ভবনে আয়োজিত এ বৈঠকে বিশিষ্ট আইনজীবী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক এবং শিক্ষাবিদসহ প্রায় অর্ধশত সংবিধান বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্গঠন, আইনসভার উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কারসহ কাঠামোগত নানা রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিটির সভাপতি।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর মধ্যে শনিবারের আলোচনাটি ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও গঠনমূলক। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যালোচনা বা জুডিশিয়াল রিভিউ, প্রশাসনিক আদেশের ওপর আদালতের এখতিয়ার এবং সামগ্রিক সাংবিধানিক কাঠামোর ভারসাম্য নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। পুরো আলোচনায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপরই সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার রূপরেখা নিয়েও বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপদ্ধতি, কার্যপরিধি ও কাঠামো কেমন হবে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। আইনসভায় উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তার সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক অবস্থান কী হবে এবং সেই উচ্চকক্ষের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সমাধান করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে অনেকেই প্রস্তাব দেন, উচ্চকক্ষ কার্যকর থাকলে সেখানে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে স্পিকার কিংবা অন্য কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন করা যেতে পারে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; বিশেষজ্ঞরা তাঁদের পূর্ণাঙ্গ লিখিত সুপারিশ জমা দেওয়ার পর কমিটি সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবনার আলোকে ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য দেখা গেছে। অর্থবিল, আস্থা বা অনাস্থা প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া আইনসভার অন্য যেকোনো সাধারণ প্রস্তাবে সংসদ সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে মতামত বা ভোট প্রয়োগ করতে পারবেন। বৈঠকে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা এ সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ইতিবাচক অভিমত ব্যক্ত করেছেন এবং এতে মৌলিক কোনো দ্বিমত তৈরি হয়নি। এর পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করতে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের প্রস্তাবগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির শীর্ষ পদে ভারসাম্য আনার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।
সালাউদ্দিন আহমদ জানান, সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধনের পর কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য রয়েছে। এ ছাড়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবমুক্ত রাখতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ নিশ্চিত করা কিংবা একটি শক্তিশালী স্বাধীন কমিশনের আওতায় আনার প্রস্তাব নিয়েও কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠনের রাজনৈতিক দাবি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি পরিষ্কার করেন যে বর্তমান সংসদ সদস্যরা দেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংবিধান নির্ধারিত শপথ নিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বিশেষ কমিটি হিসেবে তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক ও আইনসম্মত পথেই সংবিধান সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গণভোট বা যেকোনো রাজনৈতিক দাবি বিবেচনার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ধারা এবং প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন