শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬,

দক্ষ কর্মী পাঠাতে মহাপরিকল্পনা ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম

দক্ষ কর্মী পাঠাতে মহাপরিকল্পনা ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের পরিধি বাড়াতে ও কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অপ্রথাগত ও উদীয়মান শ্রমবাজারে নজর রেখে তরুণদের প্রশিক্ষিত করার এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে এক কোটি দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কৌশলের মূল ভিত্তি অপ্রথাগত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগানো। এ কারণে সরকার বিকল্প ও নতুন বাজারগুলোতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পরিকল্পনায় সরকারের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নত শ্রমবাজার খুঁজে বের করা, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। এর পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, আইনি সুরক্ষা এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি ফেরানোও অন্যতম উদ্দেশ্য।

মধ্যপ্রাচ্যের সনাতন গন্তব্যের বাইরে ইতালি, জার্মানি, গ্রিস ও রোমানিয়ার মতো ইউরোপের দেশগুলোর পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত বাজারে প্রবেশের জোর চেষ্টা চলছে।

দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও প্রবাসী আয় বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি বৈধ মাধ্যম ও আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বিদেশযাত্রার খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে কাজ চলছে। কর্মক্ষেত্রে প্রবাসীরা যেন কোনো ধরনের শোষণ ছাড়া সম্মানজনক পরিবেশ ও আইনি সুবিধা পান, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শ্রম আইন ও কর্মপরিবেশ যাচাই করা হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকায় বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি মজবুত করা অত্যন্ত জরুরি।

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারা দেশের ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে।

বাজারের চাহিদা বিবেচনায় আধুনিক ড্রাইভিং, তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ও হসপিটালিটিসহ মোট ৫৫টি কারিগরি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের শর্ত পূরণে ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষার ওপর বিশেষ ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। কর্মীদের সনদের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ সনদায়নের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি পাঠানো সম্ভব হলে বেকারত্ব কমার পাশাপাশি অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৭২ কোটি মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবাহ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড তিন হাজার ৫৫৮ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল।

রেমিট্যান্সের এই ধারা বজায় রাখতে অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনবল বিদেশে পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, কূটনৈতিক তৎপরতার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ৩৩৮টি অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হবে। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে কোনো খরচ ছাড়া দশ হাজার কর্মী নিতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে এই পাইলট কর্মসূচি চলছে।

জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর রয়েছে। জাপানি ভাষায় নির্ধারিত দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত কর্মীরা নির্মাণ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, বয়স্কদের সেবা ও আতিথেয়তা খাতে যুক্ত হচ্ছেন। তাদের কর্মক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার শর্ত চুক্তিতে রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা যৌথভাবে একটি ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ কাঠামো বাস্তবায়ন করছে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক পথে প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী পাঠানো। বোয়েসেল এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো তাদের যৌথ তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে কর্মীদের সঙ্গে ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ইতালি সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশে বিনামূল্যে প্রাক-বহির্গমন প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যার মাধ্যমে কর্মীরা কাজের ভিসা পাচ্ছেন।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে সরকার অনুমোদিত কর্মসূচির আওতায় নার্স ও কেয়ারগিভারদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। জার্মানির বিশেষ কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৌশলী ও তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীরা দেশটিতে সরাসরি চাকরির চেষ্টা করতে পারছেন। পূর্ব ইউরোপের রোমানিয়া, পর্তুগাল, সার্বিয়া, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরিতে কৃষি, সরবরাহ ও খাদ্য সরবরাহ খাতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে মৌসুমি কৃষি কাজ, মোটরযান মেরামত ও নির্মাণ খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে।

রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার পোশাক ও উৎপাদন শিল্পে উচ্চ কারিগরি পদের পাশাপাশি মালদ্বীপ ও সেশেলসের পর্যটন ও আবাসন খাতে কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

অভিবাসন ব্যবস্থাপনা সহজ করতে ডিজিটাল কার্ড ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধা, বিমা এবং আইনি সহায়তা মিলবে।

তথ্যসূত্র: বাসস