ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬, ১০:৩১ এএম
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান ব্যবহারের কঠোর বিরোধিতা করেন।
মন্ত্রী বলেন যে, যদি বাংলাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হয় এবং মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান জানাতে হয়, তবে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলা চলবে না। তার মতে, ইনকিলাব বাংলার নিজস্ব ভাষা নয় এবং যারা এক সময় আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এই স্লোগান মূলত তাদের সংস্কৃতির অংশ।
বক্তব্যে মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা প্রতিনিয়ত ইনকিলাব শব্দবন্ধটি ব্যবহার করছে, যা দেশের নিজস্ব সত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি নিজেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে বলেন যে, দেশকে ভালোবাসলে ভাষাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে।
অন্যথায় বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, তার এই বক্তব্যের কারণে অনেকে তাকে বিদেশি শক্তি বা ভারতের দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারেন, তবুও তিনি সত্য বলতে দ্বিধা করবেন না। মন্ত্রীর এই অবস্থানের পর বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এই স্লোগানটি নতুন করে জনপ্রিয় হওয়ার পর মন্ত্রীর এমন মন্তব্যকে অনেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখছেন।
জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক সদস্য ও দৈনিক ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম মন্ত্রীর এই যুক্তি খণ্ডন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, ইনসাফ, ইনকিলাব, ফয়সালা কিংবা আজাদির মতো শব্দগুলো এখন বাংলা ভাষারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগ শব্দটির উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, ভাষাগত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতা ও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি যুক্তি দেন যে, পর্তুগিজ, ডাচ বা ফারসি থেকে আসা বহু শব্দ যেমন আলপিন, বালতি বা আনারস এখন বাংলার নিজস্ব শব্দে পরিণত হয়েছে। তাই শুধু নির্দিষ্ট কিছু শব্দের ক্ষেত্রে আপত্তি জানানো অযৌক্তিক।তুষার আরও উল্লেখ করেন যে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় বিপ্লবীরা প্রথম ইনকিলাব শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তাই একে বিদেশি ভাষা বলে প্রত্যাখ্যান করা ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার শামিল। তুষারের মতে, ভাষার রূপতত্ত্ব অনুযায়ী ইন্টারনেটের মতো শব্দগুলো যেমন এখন বাংলা, ঠিক তেমনি ইনকিলাব বা জিন্দাবাদ শব্দগুলোও সাধারণ মানুষের মুখে মিশে গেছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ‘ফয়সালা’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তির বিষয়টিও এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমালোচকদের মতে, ফারসি বা উর্দু উৎসজাত শব্দের প্রতি এক ধরনের বিদ্বেষ থেকেই এসব আপত্তি তোলা হচ্ছে, যা ভাষা বিজ্ঞানের ব্যাকরণ বা বাস্তবতার পরিপন্থী। এই বিতর্ক এখন কেবল ভাষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন এক রাজনৈতিক ও আদর্শিক লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন