অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৯:৩৬ পিএম
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ উনিশ মাসের দীর্ঘ অপেক্ষা আর হতাশার বৃত্ত ভেঙে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়ের আনন্দে ভাসল বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ব্যাটে-বলে অপ্রতিরোধ্য পারফরম্যান্স দেখিয়ে সফরকারীদের ১৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে টাইগাররা। এই দাপুটে জয়ের ফলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ দল।
এর আগে বাংলাদেশ সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল প্রায় দেড় বছর আগে। মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে টাইগাররা টানা চারটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হারের মুখ দেখেছে এবং আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তাই এই সিরিজ জয়টি দলের জন্য ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার মঞ্চ। দীর্ঘদিন পর এমন একটি বড় সাফল্য পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ম্যাচ শেষে তিনি দলের সার্বিক পারফরম্যান্সের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। প্রথম দুই ম্যাচের টপ অর্ডার ব্যর্থতার দুঃস্বপ্ন ঝেড়ে ফেলে এদিন শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলতে থাকেন দুই ওপেনার সৌম্য সরকার ও সাইফ হাসান। তাদের অনবদ্য ১৭৬ রানের উদ্বোধনী জুটিতে ভর করে বাংলাদেশ একটি বড় সংগ্রহের শক্ত ভিত পায়।
সৌম্য সরকার ৮৬ বলে ৯১ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন, যাতে ছিল ৭টি চার ও ৪টি ছক্কা। অন্যদিকে সাইফ হাসানও ছিলেন আগ্রাসী মেজাজে, তিনি মাত্র ৭২ বলে ৬টি চার ও ৬টি ছক্কার সাহায্যে করেন ৮০ রান। দুজনই সেঞ্চুরির আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়েন। তবে তাদের গড়ে দেওয়া প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৯৬ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে তোলে।
সিরিজ জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৯৭ রান। এই রান তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্পিনারদের ঘূর্ণিজালে আটকা পড়ে ক্যারিবীয় ব্যাটাররা। নাসুম আহমেদ, রিশাদ হোসেন, অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ এবং তানভীর ইসলামের সম্মিলিত স্পিন আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে সফরকারী দল। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ পর্যন্ত ৩০.১ ওভারে মাত্র ১১৭ রানেই গুটিয়ে যায়।
বাংলাদেশের পক্ষে নাসুম আহমেদ ও রিশাদ হোসেন ৩টি করে এবং মিরাজ ও তানভীর ২টি করে উইকেট শিকার করেন। ব্যাট হাতে ৯১ রানের অনবদ্য ইনিংসের জন্য ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন সৌম্য সরকার।দীর্ঘ ১৯ মাস পর সিরিজ জয়ের পর দলের পারফরম্যান্সে স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত খুশি অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। তিনি বলেন, দলের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই সাফল্য এসেছে। বিশেষ করে দুই ওপেনারের প্রশংসা করে মিরাজ বলেন, ‘সিরিজের শেষ ম্যাচে আমাদের শুরুটা বেশ ভালো ছিল।
সৌম্য এবং সাইফ দারুণ ব্যাট করেছে। সত্যি বলতে, এই উইকেটে (মিরপুরের) রান করা সহজ ছিল না। কিন্তু সৌম্য ও সাইফ প্রথম ২০ ওভারে অনেকগুলো বাউন্ডারি মেরে প্রতিপক্ষকে শুরুতেই ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।’ ব্যাটিং ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে অধিনায়ক বলেন, ‘শেষ ৪ ম্যাচে আমরা ভালো ব্যাট করতে পারিনি। তারপরও ড্রেসিংরুমে আমরা ইতিবাচক ছিলাম। আমরা সবাই একমত ছিলাম যে, আমাদের ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই খেলতে হবে, আক্রমণাত্মক খেলতে হবে, তবেই বড় রান আসবে। আজ ছেলেরা সেটাই করে দেখিয়েছে।’
পুরো সিরিজ জুড়ে বল হাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করা লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন অধিনায়ক। রিশাদ সিরিজে ৩ ইনিংসে বল করে সর্বোচ্চ ১২টি উইকেট শিকার করেন এবং ব্যাট হাতেও ৬৮ রান করেন, যার সুবাদে তিনি সিরিজ সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন। সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে তিনি ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেছিলেন এবং পরের দুই ওয়ানডেতে সমান ৩টি করে উইকেট নেন।
রিশাদ সম্পর্কে মিরাজ বলেন, ‘পুরো সিরিজেই রিশাদ সত্যিই অসাধারণ বোলিং করেছে। পাশাপাশি সে ভালো ব্যাটিংও করেছে, যা দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’ দলগত পারফরম্যান্সের ওপর জোর দিয়ে মিরাজ বলেন, ‘আসলে সবাই যখন একসঙ্গে পারফর্ম করে, তখন অধিনায়কের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আমাকে সবাই সমর্থন করছে এবং এই সিরিজ জয়ের সব কৃতিত্ব পুরো দলের প্রাপ্য।’
এই জয়ের ধারা ভবিষ্যতে ধরে রাখার ব্যাপারেও আশাবাদী বাংলাদেশ অধিনায়ক। তিনি মনে করেন, দল যদি ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করতে পারে তবে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ আরও ভালো করবে। মিরাজ বলেন, ‘অনেক দিন পর আমরা ওয়ানডে খেলছি (মাঝে দীর্ঘ বিরতি ছিল)। যদি আমরা ধারাবাহিকভাবে খেলতে পারি, তবে আমরা আরও ভালো করব। আশা করি আগামী বছর আমরা আরও বেশি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাব।’
আপাতত ওয়ানডে সিরিজ জয়ের এই আনন্দ নিয়েই বাংলাদেশ দল চট্টগ্রামে পাড়ি জমাবে, যেখানে আগামী সোমবার (২৭ অক্টোবর) থেকে শুরু হবে দুই দলের মধ্যকার তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। ওয়ানডের এই সাফল্য টি-টোয়েন্টি সিরিজেও দলকে ভালো খেলতে উজ্জীবিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন