রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,

অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে বাংলাদেশি ভ্লগার সালাহউদ্দীন সুমন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

মে ৩১, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে বাংলাদেশি ভ্লগার সালাহউদ্দীন সুমন

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় আর দুর্গম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা ঘুরে এলেন বাংলাদেশি ট্রাভেল ভ্লগার সালাহউদ্দীন সুমন। নেদারল্যান্ডসের ওশান ওয়াইড এজেন্সির হন্ডিয়াস নামের একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজে করে এই রোমাঞ্চকর যাত্রা সম্পন্ন হয়। পুরো অভিযানটি ছিল ২০ থেকে ২১ দিনের এবং এটি সুমনের জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন।

সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বরফের রাজ্যে পৌঁছানো যেন এক অধরা স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার মতো।

আর্জেন্টিনার উসুয়া শহর থেকে রওনা দিয়ে প্রথম দুই দিন আটলান্টিক মহাসাগরে ভেসে জাহাজটি পৌঁছায় ফকল্যান্ড আইল্যান্ডে। সেখানে দুই দিন অবস্থানের পর যাত্রা শুরু হয় সাউথ জর্জিয়া আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। সালাহউদ্দীন সুমনের মতে এই সাউথ জর্জিয়া আইল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। চারপাশের সবুজ দ্বীপ আর লাখ লাখ কিং পেঙ্গুইনের দল সেখানে পর্যটকদের স্বাগত জানায়। দ্বীপে পা রাখলে মনে হয় তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

সাউথ জর্জিয়া পার হয়ে মূল অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছাতেই চারদিকে শুধু বরফের পাহাড় আর ভাসমান আইসবার্গ চোখে পড়ে। মাইলের পর মাইল জুড়ে গ্লেসিয়ার আর বরফের রাজ্যে রাজত্ব করছে সিল ও তিমি মাছ। বিশাল বিশাল সিলগুলো বরফের চাইয়ের ওপর শুয়ে রোদ পোহায়। মাঝেমধ্যেই সাগরের বুক চিরে বিশাল তিমি তাদের লেজ উঁচিয়ে ডুব দেয়। জোডিয়াক নামের বিশেষ ভেলা নিয়ে সাগরে ঘোরার সময় এই তিমিগুলো একদম কাছে চলে আসে।

এই অভিযানে টিকে থাকা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ কড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যাত্রার শুরুতেই কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছিল যে জাহাজে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও সব বড় রোগের চিকিৎসা সেখানে সম্ভব নয়। মাঝসমুদ্রে কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা মারা গেলেও ২০ দিনের আগে আর্জেন্টিনায় ফেরার কোনো সুযোগ নেই। ফকল্যান্ড পার হওয়ার পর বিমান যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ আর প্রচণ্ড দোলাচল অনেক সময় ভেতরে ভয়ের আবহ তৈরি করে।

ফেরার পথে জাহাজটিকে পাড়ি দিতে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সমুদ্র পথ ড্রেক প্যাসেজ। এখানকার ঢেউ ও আবহাওয়া এতটাই চরম ভাবাপন্ন থাকে যে বড় বড় জাহাজও বিপদে পড়ে। তবে আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থার কারণে সুমনের জাহাজটি হিসাব নিকাশ করে কম ঢেউয়ের দিক দিয়ে নিরাপদে চলে আসে। শীতকালে পুরো অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে বলে সুমন গ্রীষ্মকালে এই অভিযানে যান। গ্রীষ্মের সময়ে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকে এবং বিভিন্ন দ্বীপে নামা সহজ হয়।

মানুষের কোনো বসতি না থাকায় এখানকার মূল বাসিন্দা হলো তিমি পেঙ্গুইন আর সিল। কোটি কোটি বছর আগে তৈরি হওয়া বিশাল বিশাল আইসবার্গগুলো সাগরে পাহাড়ের মতো ভেসে বেড়ায়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে অনেক আইসবার্গ গলে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। দ্বীপে হাঁটার সময় হুটহাট বরফ ভেঙে পড়ার বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। একবার তিমি দেখার সময় একটি উঁচু পর্বতের চূড়া থেকে বিশাল বরফের অংশ ভেঙে পড়ার দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়।

অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠোর ও কড়াকড়ি। জাহাজ থেকে কোনো দ্বীপে নামার সময় বুট জ্যাকেট বা প্যান্টে বালি বা ঘাসের টুকরো থাকা নিষিদ্ধ। নামার আগে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয় যেন বাইরের কোনো উপাদান এই মহাদেশে প্রবেশ না করে। বুটের তলায় সামান্য বালির কণা থাকলেও তা পরিষ্কার করে তবেই নামতে দেওয়া হয়। আট তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল জাহাজ হন্ডিয়াসে আধুনিক থাকার রুম এবং বিশাল লাউঞ্জের ব্যবস্থা ছিল।

দীর্ঘ ২০ দিনের এই সমুদ্র যাত্রায় খাওয়া দাওয়ার বিষয়টি বেশ বড় একটি চিন্তার কারণ ছিল।

জাহাজের প্রধান শেফ ছিলেন একজন দক্ষিণ ভারতীয় এবং তিনি সাবকন্টিনেন্টের মানুষের জন্য বেশ আন্তরিক ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পর্যটকদের দেখে তিনি দারুণ খুশি হন এবং তাদের পছন্দের খাবার তৈরির আশ্বাস দেন। প্রতি বেলায় বুফেতে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কখনো সাবকন্টিনেন্টের ঐতিহ্যবাহী খাবার কখনো ইউরোপীয় আবার কখনো মধ্যপ্রাচ্যের খাবার পরিবেশন করা হতো। এর ফলে ২০ দিনে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির খাবারের একটি দারুণ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

প্রচণ্ড শীতের মধ্যে কীভাবে টিকে থাকবেন তা নিয়ে শুরুতে সুমনের মনে কিছুটা সংশয় ছিল। কিন্তু গ্রীষ্মের কারণে তীব্রতা কিছুটা কম থাকায় তিনি চার থেকে পাঁচ দিন অ্যান্টার্কটিকার বিভিন্ন দ্বীপে অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পেরেছেন। বরফের দেশে পেঙ্গুইনদের জীবনযাত্রাও কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে। তীব্র রোদে পেঙ্গুইনরা বরফের ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নেয় কারণ তারা শীত ছাড়া অন্য আবহাওয়া সহ্য করতে পারে লাভ করে না। সাগরের পানিতে হাত দিলে মুহূর্তেই অবশ হয়ে আসার মতো অবস্থা তৈরি হয়।

বিপদ বা ভয়ের চেয়ে প্রকৃতির এই আদিম রূপ উপভোগ করতেই বেশি মশগুল ছিলেন সুমন।

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে পৃথিবীর শেষ সীমানায় পৌঁছানো সুমনের জন্য ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। আধুনিক ক্রুজ শিপগুলোর চমৎকার সুযোগ সুবিধা এবং বহুজাতিক পরিবেশ পুরো ভ্রমণকে সহজ করে তোলে। প্রকৃতির এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়েছে বলে তিনি জানান। এই সফর শুধু একটি দেশের সীমানা পেরোনো নয় বরং প্রকৃতির এক অপার রহস্যের মুখোমুখি হওয়া। ২০ দিনের এই সফর সুমনের মনে চিরকালের জন্য দাগ কেটে গেছে।