সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬,

পর্যটন খাতে উচ্চ খরচ পিছিয়ে পড়ার কারণ ও সংকট

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১১:০০ এএম

পর্যটন খাতে উচ্চ খরচ পিছিয়ে পড়ার কারণ ও সংকট

পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার অপার সম্ভাবনা থাকলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পর্যটন বিকাশে সুবিধা করতে পারছে না বাংলাদেশ। একই মানের সুযোগ-সুবিধা পেতে একজন পর্যটককে দেশে গুনতে হচ্ছে অস্বাভাবিক বাড়তি অর্থ। অতিরিক্ত মুনাফা করার মানসিকতা, ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবকে এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন পর্যটক ও খাত সংশ্লিষ্টরা। যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার হিসাব মেলাতেই একজন ভ্রমণপিপাসুর কাছে বদলে যায় দৃশ্যপট।

আঞ্চলিক বাস্তবতায় প্রতিবেশী ভারত, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কার চেয়ে বাংলাদেশে ভ্রমণ ব্যয় অনেকটাই চড়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্যাকেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অংশে ঘোরার ক্ষেত্রে একই মানের সেবার জন্য বাংলাদেশে খরচ প্রায় দ্বিগুণ। এমনকি শ্রীলঙ্কা বা নেপালে দিনে যে খরচে স্বচ্ছন্দে ঘোরাঘুরি করা যায়, দেশে সেই মানের ভ্রমণ অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

ভ্রমণকারীদের ভাষ্যমতে, ভারতের শিলং কিংবা দার্জিলিং অথবা নেপালের মতো আন্তর্জাতিক গন্তব্যে জনপ্রতি দিনে দুই থেকে চার হাজার টাকা খরচ করে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। অথচ ঢাকার খুব কাছের গন্তব্য গাজীপুর বা মানিকগঞ্জের কোনো রিসোর্টে গেলে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ খরচ হয়ে যায়। পরিবার নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে কোনো দর্শনীয় স্থানে তিন থেকে চার দিন কাটাতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তার অর্ধেক খরচে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ঘুরে আসা সম্ভব বলে জানান পর্যটকরা। যাতায়াত খরচ কিছুটা বেশি হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা এবং খাওয়ার ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম। ফলে অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের কাছেও দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারাচ্ছে।

ব্যবসা পরিচালনার চড়া ব্যয় পর্যটন খরচ বাড়ার অন্যতম বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তারা জানান, পর্যটন স্পটগুলোতে অবকাঠামো ও ব্যবসা গড়ে তুলতে বহু পক্ষকে সামাল দিতে হয়। যেখানে আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের মতো ঘটনা ঘটে। এর বাইরে সেবার একটি ন্যূনতম মান বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা করতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। ফলে যেকোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে দ্রুত বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা সেবামূল্যের ওপর সরাসরি চাপ ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষকদের মতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিচিত জায়গার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এই সংকটের পেছনে দায়ী। দেশে বহু বৈচিত্র্যময় পর্যটন গন্তব্য থাকার সুযোগ থাকলেও উন্নত অবকাঠামোর অভাবে ঘুরেফিরে পর্যটকদের মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট গন্তব্যেই যেতে হয়।

হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো কীভাবে সেবার মূল্য নির্ধারণ করছে, সেখানে সরকারি নজরদারি জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অল্প সময়ে বা স্বল্পসংখ্যক পর্যটকের কাছ থেকে পুরো মুনাফা তুলে নেওয়ার মানসিকতা পরিহার না করলে পর্যটকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকবেন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যবসা না দেখে একে একটি সমন্বিত ও টেকসই সেবা শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা।