অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত হাকালুকি হাওর দেশের বৃহত্তম এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। শরতের নীল আকাশ আর সাদা মেঘের মিতালিতে এই হাওড় এক রূপকথার রূপ নেয়।
এর মোট আয়তন ১৮,১৫ হেক্টর। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ছয়টি উপজেলাজুড়ে হাকালুকির বিস্তার। উপজেলাগুলো হলো—ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া। এর ৮০ শতাংশ অংশ মৌলভীবাজার জেলায় এবং বাকি ২০ শতাংশ সিলেট জেলায় পড়েছে। হাকালুকির এই বিশাল জলরাশিতে ছোট-বড় প্রায় ২৩৮টি বিল এবং ১০টি নদীর অববাহিকা যুক্ত রয়েছে। ভরা মৌসুমে এটি বিশাল সমুদ্রের রূপ ধারণ করে। শুকনো মৌসুমে এর চার ভাগের এক ভাগ অংশে পানি থাকে এবং বাকি অংশ কৃষিজীবীদের দখলে চলে যায়।
হাকালুকির বুকে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা হিজল ও করচের বাগান এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তৈরি এসব সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলজ বনের কারণে হাওড়টি পাখপাখালির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে হাকালুকির ৮০০ থেকে ১০০০ হেক্টর জলাভূমিতে হিজল ও করচের গাছগুলো পানির ওপর মাথা উঁচু করে থাকে।
হাকালুকিকে বলা হয় মাছের গর্ভাধার বা মাদার ফিশারি। পানির পরিমাণ ও মাছের ধরণ বুঝে এখানে জেলেরা জাল ফেলেন। পেশাদার জেলেরা ৩০০ থেকে ৪০০ হাত লম্বা বের জাল বা বাধাই জাল ব্যবহার করেন। ছোট-বড় মিলিয়ে একসময় এখানে প্রায় ১৫০ প্রজাতির মাছ ছিল। বর্তমানে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টন মাছ আহরণ করেন জেলেরা। এখানকার তাজা মাছ পাইকারদের মাধ্যমে সরাসরি ঢাকা যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন আড়তে চলে যায়। পর্যটকদের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে হাওড়ের বুকে তৈরি করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার।
এখান থেকে পর্যটকরা পাখির চোখে হাওড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। তবে সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে হাওড়পারের মানুষের কঠোর জীবনসংগ্রামের চিত্র। হাওড়ের প্রায় ১৮৭ থেকে ২০০টি গ্রামের এক লাখ ৯ হাজার মানুষ বর্ষায় জলবন্দি জীবন কাটান।
নদীভাঙন ও ঢেউয়ের আঘাতে বহু মানুষের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী জানান, একসময় তাদের ১২ কেয়ার বা বিশাল বাড়ি থাকলেও ভাঙনে তা ছোট হয়ে এসেছে। বর্ষার সময় স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের যাতায়াত করতে হয় নৌকায়। তীব্র ঢেউয়ের কারণে অনেক সময় তারা পরীক্ষা দিতেও যেতে পারে না। চিকিৎসাসেবার জন্যও ফেঞ্চুগঞ্জ বা জেলা সদরের হাসপাতালে পৌঁছাতে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
হ হাওড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগও দেখা যায়। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার কালিমপুর ইউনিয়নের হালনা গ্রামে শিপু ভাইয়ের বাড়িটি ‘পাখি বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত। বিগত ২৫ বছর ধরে তার পরিবার কোনো ধরনের শিকারিকে এই বাড়ির আশপাশে পাখি শিকার করতে দেয়নি। নানা বাধার মুখেও তারা এই পরিবেশ রক্ষা করে চলেছেন।
শরতের নীল জলে ভেসে থাকা হাকালুকি হাওড় যেমন একদিকে অপার সৌন্দর্যের প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি এর চারপাশে রয়েছে হাওড়বাসীর অন্তহীন জীবনসংগ্রামের গল্প। প্রকৃতি আর মানুষের এই মিতালিই হাকালুকিকে দেশের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত করেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন