অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
তারেক রহমান সরকারের বড় অবকাঠামো পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকা এই মেগা প্রকল্পটির জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) সঙ্গে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি অর্থবছরে শুধু সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্যই রাখা হয়েছে সাড়ে চার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটসহ সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্ট, কারিগরি কাঠামো, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্ভাব্যতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব যাচাই করা হচ্ছে। সমীক্ষাটি আট থেকে নয় মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
এর আগে ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিএনপির গত মেয়াদে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের জন্য চারটি পথ বিবেচনা করেছিল জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। পথগুলো হলো—পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ, দোহার-চরভদ্রাসন, মাওয়া-জাজিরা এবং চাঁদপুর-ভেদরগঞ্জ। সে সময় নদীর গতিপ্রকৃতি, যোগাযোগ ও প্রকৌশলগত দিক বিবেচনা করে মাওয়া-জাজিরাতেই তৈরি হয় সাড়ে ছয় কিলোমিটারের প্রথম পদ্মা সেতু। এবার বিকল্প হিসেবে থাকা পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ রুটটিই দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।
## অর্থনীতি ও যোগাযোগে যে পরিবর্তন আসবে
এই সেতু দৃশ্যমান হলে শুধু মানিকগঞ্জ ও রাজবাড়ী নয়, সরাসরি সুবিধা পাবে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইলের একাংশ ও যশোর। এসব জেলার সঙ্গে রাজধানীর দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। কৃষি ও শিল্পে এর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত ঢাকার বড় বাজারে পৌঁছাবে। শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন সহজ হলে নতুন কারখানা গড়ে ওঠার পাশাপাশি বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
## যুক্ত হতে পারে রেললাইন, নকশায় তিন প্রস্তাব
শুধু সড়ক নয়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ রাখার সুপারিশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে। সেতুর আকার ও নকশা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে অন্তত তিন ধরনের অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা চলছে।
একটি ধারণায় ওয়াই-আকৃতির সেতুর মাধ্যমে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও পাবনাকে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, যার দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ১২ কিলোমিটার। এছাড়া উল্টো সেভেন-আকৃতির অ্যালাইনমেন্টের মাধ্যমেও এই তিন জেলাকে যুক্ত করার চিন্তা রয়েছে। অন্যদিকে শুধু পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া অংশে সেতুর দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে রাখা গেলে ব্যয় তুলনামূলক কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
## নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়ন ও চীনের আগ্রহ
এর আগে একটি সমীক্ষায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছিল চার দশমিক আট কিলোমিটার। প্রস্থ ১৮ দশমিক এক মিটার, দুই প্রান্তে প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার নদী শাসনের কাজ ধরার কথা ছিল। তখন প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব এসেছিল প্রায় ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। তবে এখন নদীর গতিপথ ও অর্থনীতির আকার বদলানোয় নতুন সমীক্ষার ওপরই ভরসা করছে সরকার।
গত ডিসেম্বরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত জাইকার একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, এই সেতু নির্মাণে পূর্ত কাজে ব্যয় হতে পারে সাত হাজার ৯০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আর মূল্য সমন্বয় খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৬৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু হয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে জাইকাকে সরকার এখনো চূড়ান্ত কোনো দায়িত্ব দেয়নি।
এই শূন্যস্থান পূরণে এরই মধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। সেতু বিভাগ চীনা অর্থায়নের জন্য একাধিক বড় প্রকল্প প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুও রয়েছে। এটি নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা আরও বাড়বে।
## বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সেতু নির্মাণ করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। সেতুর সুফল পেতে হলে এর চারপাশের সড়ক ও সংযোগ অবকাঠামোকেও উপযুক্ত করে তুলতে হবে। অর্থাৎ সেতুকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি।
নির্বাচনের আগেই এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে এখনো চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট, অর্থায়ন বা নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি। সবকিছু নির্ভর করছে সমীক্ষা ও অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার গতির ওপর। প্রথম পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অংশকে যুক্ত করেছে, আর দ্বিতীয় পদ্মা সেতু মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক সংযোগের আরেকটি নতুন দরজা খুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন