জুন ২৩, ২০২৬, ১০:৩৬ এএম
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে অবস্থিত কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর উত্তরবঙ্গের এক প্রাচীন সংগ্রহশালা। দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে ঢেপা নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী কান্তজিউ মন্দিরের পাশেই এটি গড়ে উঠেছে। বাংলার প্রাচীন ধর্মীয় শিল্পের নীরব সাক্ষী হিসেবে এটি পরিচিত।
এখানে আগত দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে বিভিন্ন দেব-দেবীর সারি সারি সাজানো দুর্লভ কষ্টিপাথরের মূর্তিগুলো। এই নিদর্শনগুলো উচ্চতায় ১ ফুট থেকে ১০ ফুট এবং ওজনে ৫ কিলোগ্রাম থেকে ৮৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে হাজার বছর আগে ভারতের রাজমহল পাহাড়ের বিশেষ পাথর দিয়ে এই দেবমূর্তিগুলো নির্মাণ করা হতো। দ্বাদশ শতকের পর সেই পাহাড়টি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এই বিশেষ পাথরটি এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না। বর্তমানে নতুন করে কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হওয়ায় এই প্রাচীন নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক ও আর্থিক মূল্য অপরসীম।
ভবনে প্রবেশ করতেই প্রথমে দর্শনার্থীদের নজর কাড়বে তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত সিদু কানু চত্বর। মূল ভবনের দেয়ালজুড়ে থাকা শৈল্পিক টেরাকোটা অলংকরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক বিশাল সম্ভার দেখা যায়। এর সুশৃঙ্খল সংগ্রহশালায় সাজানো রয়েছে কয়েকশ বছর আগের রাজকীয় ও mughal আমলের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তৎকালীন মানুষের ব্যবহৃত নানা প্রাচীন উপকরণ, কারুকার্যময় শিল্পকর্ম এবং দুষ্পাপ্য সোনা ও রুপার মুদ্রা এখানে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে।
এই সংগ্রহশালাটি দেখার জন্য দর্শনার্থীদের জনপ্রতি মাত্র ২০ টাকা মূল্যের প্রবেশ টিকিট কাটতে হয়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু করে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী কেন্দ্রটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। সপ্তাহের প্রতি রোববার এবং অন্যান্য সাধারণ সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এটি বন্ধ রাখা হয়।
রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলপথ উভয় মাধ্যমেই দিনাজপুরে যাতায়াত করা যায়। ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর, আসাদ গেট বা উত্তরা থেকে এসি ও নন-এসি বিভিন্ন বাস নিয়মিত দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মানভেদে এসব বাসের ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পঞ্চগড়গামী বাসে উঠলে সরাসরি কান্তনগর মোড়ে নেমে যাওয়া সম্ভব।

পাশাপাশি ঢাকার কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করে। আসন শ্রেণীভেদে ট্রেনের টিকিটের মূল্য ৬৩০ টাকা থেকে ২২১৮ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। দিনাজপুর শহর থেকে সিএনজি, অটো বা বাসে চড়ে পঞ্চগড় মহাসড়ক ধরে কাহারোল উপজেলার কান্তনগর মোড়ে আসতে হয়। সেখান থেকে ঢেপা নদীর ওপর নির্মিত কান্তনগর ব্রিজ পার হলেই এই প্রাঙ্গণে পৌঁছানো যায়।
রাত্রিপাসের জন্য জাদুঘরের পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি রেস্ট হাউস রয়েছে। সেখানে থাকার জন্য আগে থেকে ঢাকা বা বগুড়ার আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। সরাসরি গিয়ে সেখানে কক্ষ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই অধিকাংশ দর্শনার্থী রাতে থাকার জন্য দিনাজপুর শহরে ফিরে আসেন। শহরের মোটেল ও বিভিন্ন বেসরকারি হোটেলে ৫০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকার মধ্যে রুম পাওয়া যায়। খাবারের জন্য আশেপাশের সাধারণ হোটেলগুলোতে ঘরোয়া পরিবেশের মাছ-ভাত পাওয়া যায়। ভালো মানের রেস্তোরাঁ চাইলে কান্তনগর মোড় বা হাইওয়ের পাশের হোটেলগুলোই প্রধান ভরসা। দিনাজপুরে এলে এখানকার বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী দই-চিড়া খেয়ে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন