আগস্ট ২১, ২০২৬, ১০:১৫ পিএম
পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত অ্যামাজন রেইনফরেস্ট এক বিশাল রহস্যময় জগত। এখানকার নদীগুলোতে বাস করে হাজারো প্রজাতির প্রাণী এবং গহীন জঙ্গলে টিকে আছে আদিবাসীদের প্রাচীন জীবনধারা। এই জঙ্গলে যেমন রয়েছে রাক্ষুসে পিরানহা, তেমনি আছে এমন সব গাছ ও পোকা যা মানুষের কল্পনারও বাইরে। অ্যামাজনে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম মূলত বোট বা ছোট বিমান।
অ্যামাজনের কালো পানির নিচে লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর রেড বেলি পিরানহা ও হোয়াইট পিরানহা।
রেড বেলি পিরানহা পৃথিবীর সবচেয়ে আক্রমণাত্মক প্রজাতির একটি। এদের দাঁত ব্লেডের চেয়েও ধারালো। অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান অনায়াসে কেটে ফেলার ক্ষমতা এদের আছে। নদীর পানিতে কাঁচা মাংস ফেললে মুহূর্তের মধ্যে এরা দলবদ্ধ হয়ে তা ছিঁড়ে খায়। মাংস খাওয়ার জন্য এরা এতটাই চতুর যে, দড়িতে বেঁধে মাংস দিলে তারা প্রথমে দড়ি কেটে মাংস ছিনিয়ে নেয়।

অ্যামাজনের পানিতে এক ফোঁটা রক্ত পড়লে মুহূর্তেই পিরানহার দল জেগে ওঠে।
ইতিহাসে পিরানহার আক্রমণের ভয়ংকর সব নজির রয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ব্রাজিলের অ্যামাজন অঞ্চলে নৌকাডুবিতে ছয় বছর বয়সী এক শিশু পানিতে পড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করা হলে তার পায়ে পিরানহার ভয়াবহ কামড়ের চিহ্ন পাওয়া যায়। এক হাজার নয়শো ছিয়াত্তর সালে একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার পর অনেক মৃতদেহে পিরানহার আক্রমণের প্রমাণ মিলেছিল।
অ্যামাজনের পানিতে শুধু পিরানহাই নয়, আরও অনেক মাংসাশী মাছ রয়েছে।
পানিতে এমন কিছু মাছ আছে যা ছয়শো থেকে আটশো ওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। নদী পেরিয়ে জঙ্গলের গভীরে গেলে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। ভারী বৃষ্টির কারণে জঙ্গলের ভেতরের অনেক জায়গার মাটি চোরাবালির মতো নরম হয়ে যায়। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও সেখানে পা রাখলে মানুষ ধীরে ধীরে কাদায় তলিয়ে যেতে থাকে।
পথ চলার সময় বিষাক্ত পোকামাকড় প্রতিনিয়তই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ওয়াসপ বা এক বিশেষ ধরনের বোলতা এই জঙ্গলের ভয়ংকর পোকাগুলোর একটি। দেখতে পিঁপড়া ও মৌমাছির সংমিশ্রণের মতো এই পোকা একই ব্যক্তিকে একাধিকবার হুল ফোটাতে পারে। এর বিষে শরীরে তীব্র ব্যথা, ফোলাভাব এমনকি শ্বাসকষ্টও হতে পারে। জঙ্গলের গভীরে বসবাস করা আদিবাসীদের জীবনধারণের প্রধান উৎস শিকার ও প্রকৃতির লতাপাতা। প্রতিদিন সকালে তারা বন্দুক হাতে বানর শিকারে বের হয়।
আগে তারা তীর ও ধনুক ব্যবহার করলেও এখন বন্দুকের সাহায্যে শিকার করে।
বানরের মাংস আদিবাসীদের অন্যতম প্রধান খাবার। পাতার সাহায্য নিয়ে বিশেষ শব্দ করে তারা গাছের ওপর থাকা বানরকে ডাকার চেষ্টা করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে তারা শিকারের পেছনে ঘোরে। অনেক সময় দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পরও শূন্য হাতে তাদের গ্রামে ফিরতে হয়। পাম গাছের ভেতরে বেড়ে ওঠা সাদা রঙের শুককীট বা লার্ভা তারা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে খায়।
দেখতে অদ্ভুত হলেও এই পোকাতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট ও খনিজ উপাদান থাকে।
জঙ্গলে টিকে থাকার জন্য আদিবাসীদের নিজস্ব কিছু অসাধারণ কৌশল আছে। অ্যামাজনের মশা অত্যন্ত ভয়ংকর এবং সাধারণ উপায়ে এদের ঠেকানো কঠিন। মশার হাত থেকে বাঁচতে আদিবাসীরা এক ধরনের বিশেষ পিঁপড়ার বাসা ভেঙে সেই পিঁপড়া নিজেদের গায়ে মাখে। পিঁপড়া থেকে লেবুর মতো তীব্র গন্ধ বের হয়, যা পোকামাকড়কে দূরে রাখে।

গভীর জঙ্গলে বিশুদ্ধ পানির অভাব মেটাতে তারা বিশেষ ধরনের লতা বা ডাল কাটে।
সেই ডাল থেকে প্রচুর পরিমাণে পরিষ্কার ও সুপেয় পানি বের হয়। উদ্ভিদ জগতেও রয়েছে দারুণ সব বৈচিত্র্য। এখানকার ওয়াকিং ট্রি বা হাঁটা গাছ স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত। বড় বড় শেকড়যুক্ত এই গাছগুলো সূর্যের আলোর খোঁজে সময়ের সাথে সাথে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে বলে ধারণা করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে পুরনো শেকড় মরে গিয়ে নতুন শেকড় গজালে গাছটি সরে যাচ্ছে বলে দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়।
মিল্ক ট্রি নামের এক ধরনের গাছ আছে, যার গায়ে আঘাত করলে দুধের মতো সাদা রস বের হয় এবং আদিবাসীরা সেটি পান করে।
অ্যামাজনে এমন এক ধরনের গাছ আছে যার ডাল কাটলে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়। আদিবাসীরা সেই বিষ নদীতে ফেলে মাছ শিকার করে। এছাড়া বাঁশের মতো দেখতে বিশেষ এক প্রজাতির গাছ কেটে তারা ভেতর থেকে নারকেলের শ্বাসের মতো এক ধরনের ফল বের করে খায়। জঙ্গলের প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ত্রিশ কেজির বেশি ওজনের বিশালাকার সাপ।
বিশাল সাপগুলো সাধারণত নির্জন স্থানে বা গর্তে লুকিয়ে থাকে।
লাল, নীল ও হলুদ রঙের ম্যাকাও পাখি জোড়ায় জোড়ায় আকাশে ওড়ে। গাছের পাতায় পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট পাখি হামিংবার্ড ডিম পাড়ে। গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে সবচেয়ে ধীরগতির স্তন্যপায়ী প্রাণী স্লথ। দিনে পনেরো থেকে বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত তারা ঘুমায়। এদের চলাফেরা এতটাই ধীর যে অনেক সময় এদের শরীরে শ্যাওলা জন্মে যায়।
বুলেট এন্ট নামের এক প্রকার পিঁপড়া এই জঙ্গলের আরেক আতঙ্কের নাম।
স্থানীয়দের মতে, এর এক কামড়ে তীব্র ব্যথায় মানুষের জ্বর চলে আসতে পারে। এই ব্যথাকে অনেকেই বন্দুকের গুলি লাগার সাথে তুলনা করেন। অ্যামাজনের আদিবাসীদের জীবনযাত্রা শহুরে মানুষের কাছে একেবারেই অচেনা। গ্রামে কোনো অতিথি গেলে ছোট শিশুরা তাদের নিজস্ব ভাষায় নেচেগেয়ে স্বাগত জানায়। এতসব বিপদের পরও অ্যামাজনের মাটিতে অসংখ্য ভোজ্য মাশরুম জন্মায়।
তথ্যসূত্র: এমডি ওয়াকিফ ট্রাভেলস

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন