অক্টোবর ২, ২০২৫, ১২:০৪ এএম
খুলনা, ১ অক্টোবর, ২০২৫—খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আঙ্গারদহ গ্রামের ৪০ বছর বয়সি আকলিমা বেগম শিম চাষের মাধ্যমে শুধু নিজের ভাগ্যই বদলে দেননি, গোটা অঞ্চলের গ্রামীণ নারীদের কাছে তিনি এখন এক অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত। বাক্প্রতিবন্ধী স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে এই লড়াকু নারী ২০১৬ সালে লিজ নেওয়া জমিতে শিম চাষ শুরু করেন।
এখানে একটা জিনিস পরিষ্কার: আকলিমার এই উদ্যোগ ডুমুরিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তিনি বাসস'কে বলেছেন, গত বছর এক বিঘা জমিতে শিম আবাদে তাঁর তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, আর সেই শিম বিক্রি করে খরচ বাদে তিনি দুই লাখ টাকা লাভ করেন। ২০১৬ সাল থেকে এই শিম চাষের আয় থেকেই তিনি পাকা ঘর বানিয়েছেন, গৃহস্থালি আসবাবপত্র কিনেছেন, এমনকি একটি গবাদিপশুর খামারও শুরু করেছেন।
একসময় চিংড়ি চাষের জন্য পরিচিত ডুমুরিয়া উপজেলা এখন শিম চাষের মাধ্যমে দেশের একটি প্রধান সবজি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিম চাষ এখন ১৭০ কোটি টাকার এক বিশাল শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে, যা ২২৬টি গ্রামের গ্রামীণ জীবিকা নির্বাহ করছে এবং কৃষিতে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিয়েছে।উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত বছর ডুমুরিয়ায় দুই মৌসুমে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়।
-
গ্রীষ্মকালীন (বারি-৩, বিস্কুট ও রুপসী বাংলা জাত): উৎপাদিত শিম ৭ হাজার ৬০০ টন, যা বিক্রি হয়েছে ১০৭ কোটি টাকায়।
-
শীতকাল: উৎপাদিত শিম ১০ হাজার ৫০০ টন, যা বিক্রি হয়েছে ৬৩ কোটি টাকায়।
ওই অঞ্চলে মোট ২ হাজার ২৮০ কৃষক শিম চাষে জড়িত। এর মধ্যে ৯১০ জন নারী সরাসরি বীজ বপন, যত্ন নেওয়া এবং ফসল তোলার কাজে যুক্ত রয়েছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইনসাদ ইবনে আমিন বলেছেন, শিম চাষ নারীর ক্ষমতায়ন এবং ডুমুরিয়ায় কৃষিতে বৈচিত্র্য এনেছে।শিম চাষ এই অঞ্চলে একটি গতিশীল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক ও আশপাশের গ্রামীণ রাস্তাগুলোর ধারে অন্তত ২৩টি বাজারে শিম বেচাকেনা হয়, যার মধ্যে ছয়টি পাইকারি বাজার।
কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও শ্রমিকসহ ৭ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি এই কেনাবেচার শৃঙ্খলের সাথে জড়িত।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুনিরুল ইসলাম বলেছেন, "শিম চাষ ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আকলিমার মতো নারীদের জন্য এটি মর্যাদা ও আর্থিক স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করে।" তিনি আরও বলেন, এই চাষ ডুমুরিয়ায় চিংড়ির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করছে এবং জলবায়ু সহিষ্ণুতা গড়ে তুলছে।
খুলনা কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইল জেলার ৫শ' হেক্টর জমিতে ৬ হাজার ১৩৫ টন শিম উৎপাদিত হয়েছে এবং এই অঞ্চলের শিম উৎপাদনের ৫০ শতাংশেরও বেশি শুধু ডুমুরিয়া থেকেই আসে।একসময় চিংড়ির জন্য পরিচিত ডুমুরিয়া এখন নারীদের শিম চাষের মাধ্যমে একটি সবজি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে—এটা সত্যিই দারুণ এক পরিবর্তন।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন