মে ২৩, ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম চেতনা ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল অনন্য। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমান সমাজ যখন শিক্ষা, দীক্ষা ও আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কোণঠাসা, ঠিক তখনই নজরুলের সাহিত্য হয়ে ওঠে এক জাজ্বল্যমান শক্তি।
বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আহমদ শরীফের মতে, ইংরেজ শাসকরা নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তৎকালীন মুসলিম সমাজকে দুর্বল এবং হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে প্রশাসনিক সুবিধা দিয়ে শক্তিশালী করেছিল, যা সামাজিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনে।
এই চরম প্রতিকূল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই মূলত কাজী নজরুল ইসলামের বৈপ্লবিক আবির্ভাব ঘটেছিল।তিনি অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে সমসাময়িক কালের রাজনৈতিক দাসত্ব ও হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধে কড়া আঘাত হানেন।
তাঁর সাহিত্যিক লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ দ্বিমুখী—একদিকে পিছিয়ে পড়া সমাজকে আত্মপরিচয়ের আলোয় উদ্ভাসিত করা, অন্যদিকে মানবজাতির সর্বজনীন মুক্তির দর্শন প্রতিষ্ঠা করা। লেখক আবুল মনসুর আহমদের মতে, নজরুলের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের মুসলিম লেখকেরা ছিলেন এক প্রকার কোণঠাসা ও দুর্বল সামর্থ্যের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে। কিন্তু নজরুল ইসলাম এসে ‘আল্লাহু আকবর’ হাঁক মেরে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মুসলিম বাংলার মনের দৈন্য ও ভাবের হীনম্মন্যতা দূর করে এক মানসিক বিপ্লব ঘটান।নিজের ‘আমার লীগ, আমার কংগ্রেস’ প্রবন্ধে কবি স্পষ্ট করেছিলেন যে তাঁর কবিতা মূলত আল্লাহর দেওয়া শক্তি।
তিনি আজীবন মুসলিমদের সংঘবদ্ধ করার জন্য তাদের অলসতা, জড়ত্ব ও কর্মবিমুখতা দূর করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। নজরুলের ইসলাম উপজীব্য সাহিত্য মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার, মানবমুক্তির মহান আদর্শ এবং জাতি-বর্ণের ভেদাভেদহীন বিশ্বভ্রাতৃত্ব। তিনি ইসলামের ইতিহাসকে কেবল অতীত স্মৃতির রোমন্থন হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং একে সংগ্রামের প্রধান সাহিত্যিক কৌশল হিসেবে প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এই বীরত্বচেতনা ছিল নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত মানুষের আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের একটি অন্যতম মাধ্যম।কবির ভাষাশৈলীতে বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি, ফারসি, উর্দু ও তুর্কি শব্দের সৃজনশীল সংমিশ্রণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
মধ্যযুগের মূল ধারার এই ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে তিনি আধুনিকতার সঙ্গে চমৎকারভাবে সমন্বয় করেন, যা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সংস্কৃত প্রভাবিত ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাগুলো তরুণদের মাঝে নতুন করে এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে দেখা দিয়েছিল। বর্তমান যুগের তরুণদের বেকারত্ব ও হতাশা দূর করতে এবং বৈশ্বিক ধর্মীয় মেরুকরণের এই ক্রান্তিকালে নজরুলের সাম্যবাদী মানবতাবাদের আদর্শ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন