বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,
মা ইলিশ রক্ষা

মা ইলিশ রক্ষায় মধ্যরাত থেকে মাছ ধরায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

মা ইলিশ রক্ষায় মধ্যরাত থেকে মাছ ধরায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু

মা ইলিশের বাঁধাহীন ও নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতের লক্ষ্যে বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী নদনদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। আইন মেনে গভীর সমুদ্র থেকে জাল গুটিয়ে উপকূলের পোতাশ্রয়গুলোতে ফিরে আসতে শুরু করেছে সহস্রাধিক মাছ ধরার ট্রলার।

পটুয়াখালীর প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মহিপুর, আলিপুর, কুয়াকাটা এবং রাঙ্গাবালীর বিভিন্ন নদনদীতে আশ্রয় নিয়েছেন হাজারো জেলে। ফলে ঘাটগুলোতে তৈরি হয়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার শেষ মুহূর্তের হাঁকডাক ও বেচাকেনা।

তবে সাম্প্রতিক ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সাগরে নামার পর নতুন করে এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় উপকূলের মৎস্যজীবীদের মাঝে চাপা অসন্তোষ ও চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

জেলেদের দাবি, প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এখনো ইলিশের পেটে পুরোপুরি ডিম আসেনি।

প্রজনন মৌসুমের সময় নির্ধারণ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ক্ষোভ থাকলেও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে মধ্যরাতের আগেই ইলিশ শিকার বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

একই সঙ্গে অবরোধ চলাকালীন সময়ে দেশের জলসীমায় ভারত ও মিয়ানমারের জেলেদের অনুপ্রবেশ বন্ধে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক টহল জোরদার এবং প্রণোদনার পরিমাণ বাড়িয়ে তা প্রকৃত জেলেদের হাতে পৌঁছানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

কুয়াকাটা আশার আলো জেলে সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি নিজাম শেখ জানান, এবার সাগরে গিয়ে বেশিরভাগ জেলেকেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।

সাগরে দেশি-বিদেশি বড় ট্রলিং বোটের পাশাপাশি ভারতীয় জেলেদের দৌরাত্ম্য চলছে।

তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে ঘন ঘন অবরোধ দিয়ে সাধারণ প্রান্তিক জেলেদের জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে মৎস্য অধিদপ্তর।

উপকূলীয় জেলে আ. রহিম জানান, এমনিতেই সাগরে পর্যাপ্ত মাছের দেখা মিলছে না। তারপরও সরকারি নির্দেশ তারা মেনে চলছেন।

তিনি বলেন, সরকার জেলেদের যে চাল সহায়তা হিসেবে দেয়, তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং সময়মতো পাওয়া যায় না। ফলে প্রণোদনা বৃদ্ধির পাশাপাশি তা দ্রুত বিতরণের তাগিদ দেন তিনি।

ট্রলারের মাঝি মো. সোলায়মান আক্ষেপ করে জানান, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যাংকের ঋণের পাশাপাশি মহাজনের দাদনের বোঝা নিয়ে এই পেশায় জড়িত সাধারণ মানুষ এখন গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমবায় মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে সাগরে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

যখনই কিছুটা মাছের সন্ধান মেলে, তখনই বৈরী আবহাওয়া দেখা দেয়।

তিনি দাবি করেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কঠোর দায়িত্ব পালন জরুরি। অবরোধের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী দেশের জেলেরা বাংলাদেশি জলসীমায় ঢুকে নির্বিচারে মাছ চুরি করে নিয়ে যায়।

আলিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার সমিতির নেতা আ. জলিল ঘরামি জানান, সরকারি আদেশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জেলেরা মধ্যরাতের আগেই নিরাপদে তীরে ভিড়েছেন।

তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই ইলিশের তীব্র সংকট ছিল। ৫৮ দিনের অবরোধের পর একের পর এক দুর্যোগের কারণে জেলেরা সাগরে নামতেই পারেননি।

সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই এই নতুন নিষেধাজ্ঞা জেলে ও আড়তদারদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, মা ইলিশসহ সব ধরনের সামুদ্রিক মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতেই সরকার এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করছে, যা মূলত মৎস্যজীবীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেই নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, অবরোধ চলাকালে কলাপাড়া উপজেলার ১৮ হাজার নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে সরকারি বিশেষ খাদ্য প্রণোদনা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিত প্রকৃত জেলেদেরও তালিকার আওতায় আনা হবে।

মৎস্য কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ নদীতে বা সাগরে ইলিশ শিকার, পরিবহন, মজুত ও বাজারজাত করলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।