অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম
রাজধানী ঢাকা থেকে তিনশো বারো কিলোমিটার পথ দূরে পার্বত্য জনপদ বান্দরবানের পাহাড়ি কোলে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় বম জনগোষ্ঠীর বসতি। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দক্ষিণে থানচি সড়কের উত্তরধারে সোয়ালোক ইউনিয়নের ফারুকপাড়ায় গেলে দেখা মেলে এই পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বর্ণাঢ্য জীবনধারার। তৎকালীন জেলা প্রশাসক বা ডিসি ফারুক এই পাড়াটি শুরু করায় স্থানীয়ভাবে এর নাম দেওয়া হয়েছে ফারুকপাড়া। ছোট-বড় মিলিয়ে এই পাড়ায় বম জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ছয়শ জনের কিছু বেশি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এগারোটি ক্ষুদ্র কৌম সত্তার একটি হলো বম জনগোষ্ঠী।
ইতিহাস ও নৃতাত্ত্বিকদের মতে, বমদের পূর্বপুরুষরা আদিনিবাস চীনের চীনলিং পার্বত্য এলাকা থেকে প্রথমে মায়ানমারে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে এসে স্থায়ী হন। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনে পাংখোয়া ও লুসাই জনগোষ্ঠীর সাথে যথেষ্ট মিল রয়েছে। বমদের ঐতিহ্যবাহী মাচানবাড়িগুলো কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি হয়, যেগুলোকে বম ভাষায় `ইন` বলা হয়। প্রতিটি মাচানবাড়িতে সাধারণত চারটির মতো ঘর থাকে এবং রান্নাঘরের এক কোণে চুলা থাকে। রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ `থেন ইন` নামের নির্দিষ্ট স্থানে জমিয়ে রাখা হয়। পাহাড়ি উৎসের পানি পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করার সুব্যবস্থা থাকায় এখন আর দূরদূরান্ত থেকে পানি আনতে হয় না।
বম নারীদের অর্থনৈতিক ও পারিবারিক স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো কোমর তাঁত।
কোমর তাঁত নেই এমন একটি বাড়িও ফারুকপাড়ায় খুঁজে পাওয়া যায় না। বম নারীরা নিজেদের পরিধানের কাপড় ছাড়াও বাড়তি আয়ের জন্য মাফলার, থামি এবং বমশাল নামের উলের চাদর বুনে থাকেন। বম সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ হলো তাদের মনমাতানো `পুষ্প নৃত্য`। নতুন অতিথিকে স্বাগত জানাতে বা আনন্দের মুহূর্তে তরুণীরা মাথায় রঙিন পুষ্প মুকুট, `করচাই` নামের টপস ও `পুইনরাম পুই` নামের স্কার্ট পরে এই নাচে অংশ নেন। এছাড়া বম শিশুরা `থ্যানবম` নামের বিশেষ দোলনায় দুলে বড় হয়।
শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে বম সমাজে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
বমদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও পূর্বে কোনো লিপি ছিল না। বর্তমানে পঁচিশটি রোমান হরফ কাজে লাগিয়ে তৈরি ধ্বনি অনুগামী লিপি তাদের পড়ালেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফারুকপাড়ার প্রায় নব্বই শতাংশ বম এখন নিজেদের ভাষায় পড়ালেখা জানেন। এছাড়া ফারুকপাড়ার প্রায় ১৩৫টি পরিবার খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী। ১৯১৮ সালের পর থেকে তারা খ্রিষ্টীয় সুসমাচার গ্রহণের মাধ্যমে খ্রিষ্টীয় উপাসনায় যুক্ত হন এবং রবিবারগুলোতে ফারুক খ্রিষ্টীয় চার্চে সপরিবারে প্রার্থনা সভায় মিলিত হন।
জীবনজীবিকার তাগিদে জুম চাষের পাশাপাশি বম জনগোষ্ঠী এখন ফলমূল চাষে ঝুঁকছে।
নিকটবর্তী শৈলপ্রপাত পর্যটন কেন্দ্রে বম নারীরা জুমের ফরমালিনমুক্ত পাহাড়ি আনারস ও পাহাড়ি আম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। রাঙ্গওয়া, আমরুপালী, রূপালী ও গৌরমতি প্রজাতির আম উৎপাদনে তারা মুন্সিয়ানা দেখিয়ে চলেছেন। ঐতিহ্যগত বিশ্বাস, কোমর তাঁতের বুনন, প্রার্থনা ও আধুনিক শিক্ষার আলোয় বম জীবনধারা আজ পাহাড়ি প্রকৃতির সাথে মিশে এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন