অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৫:০৪ পিএম
কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা অপরিহার্য। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিক নিরাপত্তা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সংশ্লিষ্ট আইন সংস্কারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, সমাবেশে এনে শ্রমিকদের হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট তুলে দেওয়ার পরিবর্তে দলগুলোর পক্ষ থেকে ‘শ্রমিক নিরাপত্তা তহবিল’ গঠন করতে হবে।
এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত না হলে শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরের মতোই উপেক্ষিত থেকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, বেলা এগারোটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম’ এবং এর সদস্য সংগঠনসমূহের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন।
কর্মক্ষেত্রে অব্যাহত রাসায়নিক ও অগ্নিকাণ্ডসহ সকল প্রকার দুর্ঘটনা রোধ, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার, নিহত ও আহত শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, প্রতিটি কারখানায় সেইফটি কমিটি গঠন, বিদ্যমান শ্রম আইন সংশোধন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনে বক্তারা দেশের কর্মপরিবেশের ভয়াবহ চিত্র এবং আইনি দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরেন। একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বলেন, কারখানায় নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং সেই কারখানাগুলোর নিয়মিত ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন পরিদর্শন অত্যন্ত জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক সংগঠন, আইনজীবী এবং গণমাধ্যম কর্মীদেরও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি দাবি করেন, প্রতিটি কারখানার ফ্লোরে অবশ্যই একটি কার্যকর ‘সেফটি সেল’ থাকতে হবে। ফারাহ কবীর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে তারা শ্রমিকদের জন্য কী কী সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, তার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থাকতে হবে।
তিনি সম্প্রতি মিরপুরে আগুন লাগা একটি কারখানার উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে অনেক নিয়মই লঙ্ঘন করা হয়েছে। ওই কারখানায় কর্মরত অনেকের বয়স ছিল মাত্র ১৪ থেকে ১৫ বছর, যা সুস্পষ্টভাবে শিশুশ্রম ও আইন লঙ্ঘন। এই ভয়াবহ বিষয়গুলো রাষ্ট্রকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত শ্রমিকের পরিবারকে কোনো দান বা অনুদান নয়, বরং তাদের আইনি অধিকার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের বক্তব্যে বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ থাকতে হবে। তিনি দেশের বিদ্যমান শ্রম আইনের দুর্বলতাগুলো তুলে ধরে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক আইনি দুর্বলতা রয়ে গেছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যে আইনে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখার কথা, সেই আইনে মামলার সর্বোচ্চ সাজা মাত্র চার বছর। আর কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ মাত্র ২ লাখ টাকা এবং পঙ্গুত্ব বরণ করলে আড়াই লাখ টাকা। এই অমানবিক ও অপর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের আইনটি অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং যুগোপযোগী করতে হবে।
বক্তারা বিশেষ করে রাসায়নিক দুর্ঘটনা এবং আবাসিক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা থাকার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা প্রশ্ন তুলে বলেন, বিস্ফোরক রাসায়নিকের কারখানা কেন জনবহুল আবাসিক এলাকার কাছে থাকবে, এর জবাবদিহি কর্তৃপক্ষকে করতে হবে। তিনি এসব কারখানা ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
তিনি বলেন, কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোনো বালাই নেই এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক ও রাসায়নিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আবুল বাশার মিয়া বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কোনো আলোচনা নেই। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক নিরাপত্তা কী হবে, তা নিয়েও কেউ কথা বলছে না।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসএনএফ-এর মহাসচিব এবং সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে জনমনে একটি বিরূপ মনোভাব আছে, কারণ এটি প্রায়শই আমাদের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। কিন্তু এটি যদি সঠিক নীতিমালা ও প্রবিধান মেনে ব্যবহার করা হতো, তবে এমনটি হতো না। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রাসায়নিক কেমিক্যালের কারখানা বা গুদাম কোনোভাবেই আবাসিক এলাকায় রাখা উচিত নয়।
এ সময় তিনি কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা এবং রাসায়নিক দ্রব্য ও বিস্ফোরক মজুত সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাসহ আইনি ক্ষেত্রে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে মোট ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল কাদের হাওলাদার,
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদ (জিস্কপ)-এর প্রতিনিধি নাইমুল আহসান জুয়েল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)-এর সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহম্মেদ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর পরিচালক অ্যাডভোকেট বরকত আলী এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য এ কে এম নাসিম। বক্তারা সবাই একমত হন যে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং ইশতেহারে এর বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন