অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৭:৩০ পিএম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন এক ভিন্নধর্মী কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনের ডাক দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পিরোজপুর-১ আসনের মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী ও জিয়ানগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী। তিনি বলেছেন, দেশকে সত্যিকার অর্থে গড়তে হলে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিতেও আনতে হবে আমূল পরিবর্তন।
তিনি মনে করেন, নীতি যদি পুরোনো বা জনকল্যাণবিরোধী থাকে, তবে যতবারই নেতা বদল হোক না কেন, দেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, পিরোজপুর সদর উপজেলার শিকদার মল্লিক ইউনিয়নের চালিতাখালী এলাকায় দিনব্যাপী গণসংযোগ শেষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাসুদ সাঈদী তার বক্তব্যের গভীরে গিয়ে ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি নীতির পরিবর্তনের ওপর এত জোর দিচ্ছেন। তিনি বলেন, নেতৃত্ব যদি পরিবর্তন হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের নীতি-আদর্শ, জনগণের প্রতি শাসক শ্রেণির চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি যদি আগের মতোই থাকে, তবে দেশের মানুষের ভাগ্য কখনোই পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, আমাদের এখন প্রয়োজন এমন একটি সুস্পষ্ট নীতি, যা সম্পূর্ণরূপে জনগণের স্বার্থে নিবেদিত হবে, যা দুর্নীতি ও সকল প্রকার বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকবে এবং যা ন্যায়বিচার ও সুমহান মানবিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি মনে করেন, কেবল এমন নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত নেতৃত্বই পারে দেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, গত পনেরো বছর ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ আমাদের সকল ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা আমাদেরকে কোরআনের প্রোগ্রাম করতে দেয়নি, এমনকি পবিত্র রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের মতো ধর্মীয় আয়োজনও করতে বাধা দিয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা করে তাদের রক্তাক্ত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে মাসুদ সাঈদী বর্তমান সময়ের কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো কোনো দলের কর্মকাণ্ড মিলে যাচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এর ফলে জনগণ থেকে তারা ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের কারণেই আওয়ামী লীগ এ দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
এদেশের সাধারণ মানুষ ফ্যাসিবাদকে কখনোই পছন্দ করে না। তার এই বক্তব্য জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ নিয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।তিনি আরও বলেন, একজন ভালো নেতা তখনই সত্যিকার অর্থে সফল হন, যখন তিনি একটি ভালো ও জনকল্যাণকর নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাঈদী বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— যেখানে রাষ্ট্রের নীতি সঠিক থাকে, সেখানে নেতৃত্ব স্বচ্ছ ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক হয়;
আর যেখানে নীতি হয় বিকৃত বা গোষ্ঠীস্বার্থকেন্দ্রিক, সেখানে নেতৃত্বও অনিবার্যভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় ঘাটতি নেতৃত্বের নয়, বরং সঠিক নীতির। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হওয়া উচিত নীতির পরিবর্তন আনা। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন এমন নীতি প্রতিষ্ঠা করা, যা শাশ্বত সত্য, ন্যায়বিচার এবং জনগণের সার্বিক কল্যাণের দৃঢ় ভিত্তির ওপর গঠিত হবে।
উন্নয়নের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেন মাসুদ সাঈদী। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নকে শুধু রাস্তাঘাট নির্মাণ, বড় বড় ভবন তৈরি বা দৃশ্যমান মেগা প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হলো সেই দেশের মানুষের চিন্তার উন্নয়ন, চরিত্রের বিকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতি-নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ। তিনি উপস্থিত জনতাকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাই সময় এসেছে, শুধু নেতা পরিবর্তনের স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে, এবার নীতি পরিবর্তনের বৃহত্তর আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার। বক্তব্যের এই পর্যায়ে তিনি একটি স্লোগান তুলে ধরেন— ‘চাও যদি উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক দেশ, তবে প্রথমে বদলাও নীতি— তাহলেই বদলাবে বাংলাদেশ।’
এর আগে মাসুদ সাঈদী বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে যোহরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত পিরোজপুর সদর উপজেলার রানীপুর-বেকুটিয়া এলাকা, শারিকতলা ইউনিয়নের বেকুটিয়া আবাসন এলাকা, ইউনিয়নের কুমিরমারা হাফিজিয়া মাদ্রাসা, পালপাড়ার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা এবং গুয়াবাড়িয়া মাঝিবাড়ি নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গণসংযোগ করেন।
এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের সমস্যা ও দাবির কথা শোনেন। তিনি বেকুটিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার বিশিষ্ট সমাজ সেবক প্রয়াত কামাল হোসেন এবং উত্তর রানীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ডা. মোশাররফ হোসেনের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানান।চালিতাখালীর মতবিনিময় সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পিরোজপুর জেলা শাখার নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রব।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন পিরোজপুর জেলা সেক্রেটারি জহিরুল হক, জেলা অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক শেখ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের পিরোজপুর জেলা শাখার সভাপতি ইমরান হোসেন, পিরোজপুর সদর উপজেলা আমির মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান, সদর উপজেলা সেক্রেটারি মো. আরিফ বিল্লাহ, সদর উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আল-আমিন ফকির এবং শিকদার মল্লিক ইউনিয়ন আমির মাওলানা আব্দুর রব সহ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের পিরোজপুর জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতারা।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন