সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
কাপড়ের দোকান থেকে ডাকসু ভিপি পদে উঠে আসার পেছনে শৈশবের বহুমুখী বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সামাজিক মেলামেশাকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন সাদিক কায়েম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের এই সহ-সভাপতি জানিয়েছেন, বাবার কাপড়ের দোকানে বসে ক্রেতা সামলানো এবং পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাথে বেড়ে ওঠার দিনগুলোই তাঁর নেতৃত্বের মজবুত ভিত গড়ে দিয়েছে। সম্প্রতি সম্প্রচারিত ‘ইনোভা টকস’ পডকাস্টে তিনি নিজের জীবনসংগ্রামের এই স্মৃতিচারণ করেন।সাদিক কায়েমের জন্ম চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়, যেখানে তিনি বায়তুশ শরফ আতিকিয়া মাদরাসায় প্রথম শ্রেণিতে পাঠ গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে পিতা পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে কাপড়ের ব্যবসা গড়ে তোলায় পুরো পরিবার সেখানে স্থানান্তরিত হয়। খাগড়াছড়িতে বেড়ে ওঠার সময় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি দিনের একটি বড় অংশ বাবার দোকানে বসতেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা স্থানীয় রিয়াজউদ্দিন বাজার বা টেরী বাজার ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। মাদরাসার ক্লাসের ফাঁকে দোকানে বসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার এই সুযোগ তাঁর পরবর্তীতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অনুধাবনের দৃষ্টিভঙ্গি উন্মুক্ত করেছে।
পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়ের সহাবস্থানও তাঁর চেতনায় বড় প্রভাব ফেলেছে।খাগড়াছড়ির মিশ্র জনপদে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে একত্রে বড় হওয়ার অভিজ্ঞতাই তাঁকে বহুত্ববাদী নেতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। দোকানে পোশাক বিক্রি করতে গিয়ে ক্রেতার চাহিদা ও আর্থিক সক্ষমতা বুঝে সেবা দেওয়ার কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন। কোনো ক্রেতা এসে সরাসরি সবচেয়ে ভালো পোশাক দেখতে চাইলে শুরুতেই সর্বোচ্চ দামের পণ্য সামনে না এনে মধ্যম মানের পোশাকের মাধ্যমে চাহিদা যাচাই করার যে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে আজীবন সহায়তা করেছে।
তাঁর শিক্ষাজীবনও নানামুখী মোড় ও পারিবারিক ইচ্ছার ভেতর দিয়ে এগিয়েছে।চতুর্থ শ্রেণিতে খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করলেও আলেম হওয়ার মাতৃস্নেহের আহ্বানে পুনরায় মাদরাসায় ফিরে যান তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস অর্জনের পর তাঁর বাবা তাঁকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়িয়ে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও মায়ের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে মাদরাসার পাঠ্যক্রমেই অবিচল থাকেন।
পরবর্তীতে খাগড়াছড়ি বায়তুশ শরফ থেকে দাখিল ও চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ থেকে আলিম পাস করে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। একই সাথে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ফাজিলে ভর্তি হলেও দুই দিকে সময় নষ্ট না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই শতভাগ মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।একসঙ্গে দুই নৌকায় পা না দেওয়ার এই বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমিস্টারেই ৩ দশমিক ৯৪ সিজিপিএ অর্জন করে প্রথম স্থান লাভ করেন সাদিক কায়েম। তিনি উল্লেখ করেন, শৈশবের বাস্তব শ্রম, পিতা-মাতার দোয়া এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সান্নিধ্যই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করে ডাকসুর শীর্ষ পদে আসীন হতে শক্তি জুগিয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন