অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১০:২৫ পিএম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসেন হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হলেও আদালত চত্বরে এখনো শুরু হতে পারেনি মূল বিচারিক কার্যক্রম। হত্যাকাণ্ডের এক বছর পেরিয়ে গেছে। সন্তান হারানোর বিচার দেখতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন নিহত শিক্ষার্থীর বৃদ্ধ বাবা ও মা। দীর্ঘ সময় পার হলেও অভিযোগ গঠন না হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে তীব্র হতাশা আর ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। পরিবারের একমাত্র দাবি, অবিলম্বে দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নূর বক্স লেনের একটি আবাসিক ভবনে ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জোবায়েদ। সেদিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ওই ভবনের নিচতলায় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। পরে সেখান থেকে তাঁর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনায় জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন আদালতে তিনজনকে অভিযুক্ত করে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত আসামিরা হলেন জোবায়েদের ছাত্রী শাবনাম বর্ষা, তাঁর কথিত প্রেমিক মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এবং তিন অভিযুক্তই বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, গত ১১ অক্টোবর আদালতে অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য ছিল। তবে আদালত শুনানি পিছিয়ে আগামী ২৮ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। একই দিনে আসামিপক্ষের জামিনের আবেদন উত্থাপন করা হলে বিচারক তা নামঞ্জুর করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাকির হোসেন খান জানান, মামলাটি এখন তাঁদের আদালতে বিচারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, ওই দিনই অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হবে এবং এরপর দ্রুততম সময়ে আদালতে সাক্ষীদের হাজির করে সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচার নিষ্পত্তি করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বিচারকাজ শুরু হতে দীর্ঘসূত্রতায় গভীর ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত। তিনি বলেন, ভাই হত্যার বিচার প্রক্রিয়াটুকু অন্তত শুরু হলে বৃদ্ধ বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার একটু ভাষা পেতেন। আজ পুরো একটি বছর কেটে গেলেও আদালতের কার্যক্রমই শুরু হলো না। প্রতিদিন মা সন্তানের শোকে কান্নাকাটি করছেন, বাবার চোখে অবিরত পানি ঝরছে। বাবা-মা জানতে চান বিচার কবে শুরু হবে আর রায় কবে হবে, কিন্তু তাঁর কাছে কোনো সদুত্তর থাকে না। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁরা আসামিদের দ্রুত ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছেন।
আদালতে আসামিদের দায় ও ভূমিকা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন তাঁদের আইনজীবীরা। শাবনাম বর্ষার নিযুক্ত আইনজীবী নূর মাহাবুবুল আলম দাবি করেছেন, তাঁর মক্কেল সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং একটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। বিপরীত দিকে অপর আসামি মাহিরের আইনজীবী এম রাশেদুজ্জামান দাবি করেন, ত্রিভুজ প্রেমের জটিল টানাপোড়েন এবং জোবায়েদের পক্ষ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ এই ঘটনার পেছনে ছিল। তাঁর ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনায় বর্ষাই সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সবই বর্তমানে বিচারাধীন আদালতের বিচার্য বিষয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন স্বপ্নবাজ তরুণ জোবায়েদ হোসেন। পরিবার আশা বেঁধেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ শেষ করে তিনি সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ডালপালা মেলার আগেই নির্মম হত্যাকাণ্ডে ঝরে যায় একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ। একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়ে এখন কেবল সুবিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে শোকসন্তপ্ত পুরো পরিবার।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন