মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

ধর্ম নয় সবার মূল পরিচয় বাংলাদেশি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১০:১১ পিএম

ধর্ম নয় সবার মূল পরিচয় বাংলাদেশি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

ধর্মের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা হবে না এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবার মূল পরিচয় বাংলাদেশি বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জেএম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক ধর্মীয় সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করে এ দেশের জনগণকে কেউ বিভক্ত করতে পারবে না।

বক্তব্যের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা বৈষম্যহীন একটি স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে সবার জন্য সমান ধর্মীয় অধিকার থাকবে। তিনি জানান, তিনি সচেতনভাবেই ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন, কারণ রাষ্ট্রীয় বা আইনিভাবে কোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজনকে স্বীকার করা উচিত নয়। বিশ্বের সব দেশেই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর সমীকরণ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে কাউকে ‘সংখ্যালঘু’ উপমায় আবদ্ধ না করে সরকার সবাইকে সমান অধিকারসম্পন্ন পূর্ণ নাগরিক হিসেবে গণ্য করতে চায়।

নাগরিক পরিচয়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরকারপ্রধান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে একক নাগরিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ঢাকার একাধিক মন্দির ও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জেএম সেন হলে উপস্থিত হয়েছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্র সকল ধর্মাবলম্বীর নাগরিক মর্যাদা ও অধিকারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে সব ধর্মের মানুষের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে রক্ত ঢেলে দেশ স্বাধীন করেছেন। একইভাবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও সব ধর্মের ভাইবোনেরা রাজপথে নিজেদের রক্ত বিসর্জন দিয়েছেন। তাই একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। সবার আগে প্রতিটি মানুষের একমাত্র পরিচয় তিনি একজন বাংলাদেশি, এরপর তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকার ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন বা রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। অতীতে যারা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কেবল রাজনৈতিক ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করত, সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ তাদের সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। জনগণের এই আস্থা ও বিশ্বাসের মূল প্রতীক তারেক রহমান। সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যক্তিকে সাংবিধানিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সব ধর্মীয় আচার, সংস্কৃতি ও উপাসনালয়ের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

পূজার সার্বিক নিরাপত্তা ও সরকারি ছুটির বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি জানান, এবার সারা দেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ, কড়া নিরাপত্তা এবং সরকারি ছুটি বরাদ্দের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পূজার ছুটি বাড়ানোর দাবি অনুমোদন করেছেন এবং আগামী বছর প্রয়োজনবোধে নির্বাহী আদেশে এই ছুটি আরও বাড়ানো সম্ভব কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ছুটির দাবির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ছুটির দাবি রয়েছে এবং রাষ্ট্রকে সব পক্ষের সাথে ভারসাম্য রেখেই সামগ্রিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এবার উৎসব ও নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোরে স্নান করে সিঁদুর মেখে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে ও হাসিমুখে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। কোনো অপশক্তির ভোটব্যাংক না হয়ে মুক্ত নাগরিক হিসেবে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার এই পরিবেশকে তিনি নতুন বাংলাদেশের অর্জন বলে অভিহিত করেন। রাজনৈতিক হুমকি বা উস্কানির মাধ্যমে যারা জাতীয় ঐক্য নষ্টের পাঁয়তারা করছে, নাগরিক ঐক্য বজায় থাকলে তাদের কোনো ষড়যন্ত্র সফল হবে না।

অতীতের অন্যায় ও সম্পত্তি দখলের বিষয়ে কড়া সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জায়গা-জমি দখল প্রসঙ্গে তিনি অতীতের আওয়ামী লীগ শাসনামলের সমালোচনা করে বলেন, হরিমন্দিরের জমি দখল, জগদীশ হত্যাকাণ্ড এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বসতবাড়িতে হামলা ও লুটপাটের মতো ঘটনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে দীর্ঘ সময় ধরে অর্পিত সম্পত্তি দখলের যে অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তখন বিএনপির কোনো অস্তিত্বও ছিল না। বর্তমান সরকার অন্যায়ভাবে বেদখল হওয়া সব সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জমি উদ্ধারের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেন।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে ২০০৩ সালে বিগত বিএনপি সরকারের সময় মন্দিরের তিন বিঘা বেহাত জমি উদ্ধার করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানেও মন্দিরের বেশ কিছু জমি বেদখলে থাকার অভিযোগ এসেছে এবং সেগুলোও পর্যায়ক্রমে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দিতে সরকার উদ্যোগ নেবে। অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ দখল করার কোনো চর্চা তাঁদের নেই বলেই হিন্দু সম্প্রদায় সরকারের ওপর এই অধিকারের দাবি জানিয়েছে।

বক্তব্যের ইতি টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ধারণার বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সমাজে যে রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে, সব ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করাই সেই প্রতিশ্রুতির মূল অংশ। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিশ্বাসকে ভিত্তি করে সব নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে তিনি উপস্থিত সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানান।