অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পরিমার্জিত নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির শতভাগ মানসম্মত ও আকর্ষণীয় বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
ছাপাখানাগুলোতে দিনরাত চলছে মুদ্রণযজ্ঞ।
এনসিটিবির সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই মুদ্রণ এবং বাঁধাইয়ের কাজ প্রায় শতভাগ শেষ হয়েছে। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে ছাপার অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৫৭ শতাংশের বেশি। তবে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই মুদ্রণ কিছু প্রেসে শুরু হলেও সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানে এখনো আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যায়নি। যে ছাপাখানাগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তরের কাজ পেয়েছে, সেগুলোতে প্রাথমিকের বই সরবরাহ শেষে মাধ্যমিকের কাজ পুরোদমে চলছে। পাশাপাশি কিছু কারখানায় অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ের ফর্মা ছাপার কাজ চলমান রয়েছে।
চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য সারা দেশে মোট ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বই ছাপার কাজ পেয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়ি, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরিসহ) মোট ৩০ কোটি ৭৭ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ চাহিদার বইও অন্তর্ভুক্ত। এবার গত বছরের তুলনায় পুরো এক মাস আগেই মুদ্রণ কাজ শুরু করা হয়েছিল।
এনসিটিবির ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি বা ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ ছাপা শেষ হয়েছে। এই স্তরে প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টি বইয়ের, যা মোট বরাদ্দের ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক স্তরে মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি বা ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে এবং পিডিআই হয়েছে ৫ কোটি ৯১ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৯টি বা ৭৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ বইয়ের। অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে গড়ে ৯২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বই ছাপার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের সাথে দরপত্র হওয়া প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ইবতেদায়ি স্তরে মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি বা ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে। এর মধ্যে পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪২২টি বইয়ের, যা মোট পরিমাণের ৫১ দশমিক ১১ শতাংশ। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরে মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বইয়ের মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বা ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে এবং পিডিআই হয়েছে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫টি বা ৩৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ বইয়ের। সার্বিকভাবে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে গড়ে ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বই মুদ্রণ শেষ হয়েছে।
কাজের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের কাজ ৯০ শতাংশের বেশি শেষ। তবে কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের কারণে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির কাজে গতি কিছুটা কম। কাজের ধীরগতির কারণে ইতিমধ্যে ৩২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পিছিয়ে থাকা প্রেসগুলোর কাজ প্রয়োজনে বাতিল করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা এবং সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একাধিক টিম তদারকি করছে।
মুদ্রণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গুণগত মান বজায় রাখতে এবার শিক্ষা প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মানদণ্ড যাচাইয়ে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত ৫৩টি মনিটরিং টিম কাজ করছে। মানদণ্ড পূরণ না করায় দেশের ৩৬টি প্রেসের প্রায় সাড়ে ৯ লাখ নিম্নমানের ফর্মা এবং ১২ হাজার ত্রুটিপূর্ণ মুদ্রিত বই সরাসরি বাতিল ও ধ্বংস করা হয়েছে। এনসিটিবি চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়েছেন, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত বই সরবরাহে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানান, চলতি মাসের মধ্যেই প্রাথমিকের কাজ ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ এবং নভেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিকের ৯৫ শতাংশের বেশি বই পৌঁছে যাবে। এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি মান যাচাই করতে হবে; ত্রুটিপূর্ণ বই গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই নিম্নমানের কাগজের বই সরবরাহ মেনে নেওয়া হবে না। সরকার বাজারদর বিশ্লেষণ করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কম খরচের অজুহাতে কেউ নিম্নমানের বই তৈরি করতে না পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই দিতে ব্যর্থ হলে কোনো প্রতিষ্ঠানকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন