রকিবুল হাসান মুন্না
অক্টোবর ১২, ২০২৫, ০১:১৩ পিএম
ছবি-দিনাজপুর টিভি
ড. মো. শওকাত আলী, উপাচার্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি): আজ ১২ অক্টোবর, ২০২৫, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অবহেলিত উত্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়।
জন্মলগ্ন থেকে নানা সংকট সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ও গবেষণায় উন্নত জাতি গঠনের মূলমন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বেরোবি বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ গবেষণাধর্মী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতি গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, "দেশ ভালো হয় যদি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো হয়।" ঠিক যেমন মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজে সমস্যা দেখা দিলে তার চিকিৎসক হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার মাধ্যমে সমাজের সমস্যা নির্ণয় করে যথাযথ প্রেসক্রিপশন দেয় এবং সমাধানের পথ তৈরি করে দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সমৃদ্ধির পেছনে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অপরিসীম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, "আমাদের উচ্চশিক্ষার সিঁড়ি আমরা নিজেরা গড়ে তুলিনি।" গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত গবেষণামুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে—এই লক্ষ্যেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে।
গবেষণা ও গবেষণার পাশাপাশি দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রধান কাজ।
দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছি:
স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকধর্মী শিক্ষক নিয়োগ।
গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে বৃত্তি প্রদান।
ডিনস অ্যাওয়ার্ড চালু এবং নিয়মিত রিসার্চ জার্নাল প্রকাশ।
অ্যাকাডেমিক ভবন সম্প্রসারণ, নতুন ভবন নির্মাণ, আন্তর্জাতিক অনুপাতে শিক্ষক নিয়োগ এবং মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে।
পূর্বের ছাত্ররাজনীতির নামে যে ধরনের মানসিক টর্চার ছিল হলগুলোতে, আমরা তা শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছি। দলীয় ও লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধে আইন পাশ হয়েছে। হল-এর সিট বণ্টনে শতভাগ ন্যায় ও নিয়মনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, সিট বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা গেছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
শিক্ষকদের আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে IQAC নিয়মিত ট্রেনিং ও কর্মশালা আয়োজন করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে আমরা সামনে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করব। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সমাবর্তনের তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে, যা এ বছরই অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতকে সমৃদ্ধ করতে বাংলা একাডেমি থেকে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের পৈতৃক বাড়িটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে গবেষণা ইনস্টিটিউট করার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণার জন্য এটি একটি সমৃদ্ধ একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হবে।
গবেষকরা আবাসিক হিসেবে অবস্থান করে গবেষণা করতে পারবেন এবং বেগম রোকেয়ার স্মৃতি সংরক্ষণও সহজ হবে। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের জন্য একটি মাইলফলক দৃষ্টান্ত হবে।
১৭ বছরের পথচলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা দেশ ও দেশের বাইরে সফলতা অর্জন করেছে। সম্প্রতি ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন।
তাঁর বৈষম্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ সাহস ও প্রতিবাদ গোটা জাতিকে নতুন বাংলাদেশ বির্নিমাণে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আমি দৃঢ় আশা ও আস্থা রাখি, বেরোবির শিক্ষার্থীরা সমস্ত অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে আবু সাঈদের মতো দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।