মে ১৬, ২০২৬, ১০:৫১ এএম
দেশে ক্যানসার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে রোগীদের নিজস্ব পকেট থেকে খরচ হচ্ছে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ টাকা। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গত ৭ মে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এই বিপুল খরচের কারণে দেশের বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমায় নেমে গেছে এবং অসংখ্য পরিবার নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে।চিকিৎসা খরচ মেটাতে সহায়-সম্বল হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ।
বিআইডিএসের তথ্যমতে, একটি পরিবারের গড়ে প্রতি মাসে চিকিৎসা ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা, যা একটি পরিবারের মোট ব্যয়ের ১১ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারগুলোর মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে এই চিকিৎসায়, যেখানে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। শহরাঞ্চলের পরিবারগুলো গড়ে মাসে ৪ হাজার ১৯২ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করছে।
গ্রামীণ এলাকার পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ১০৯ টাকা।ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসায় গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধ, রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার এবং শয্যা ভাড়া সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ভর্তি রোগীদের মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশ ওষুধে, ১৭ শতাংশ রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় এবং ২৩ শতাংশ অস্ত্রোপচারে চলে যায়।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ফরিদপুর থেকে আসা সালমা বেগম (৫২) জানান, সেখানে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে চার মাস সময় লাগছে। বহু বছর ধরে পান, জর্দা, গুল ও সাদাপাতা ব্যবহারের কারণে তিনি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য না থাকায় সিরিয়াল আসা পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
দেশে ক্যানসার রোগী বাডার কারণ হিসেবে তামাক ব্যবহার, খাদ্যে ভেজাল, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ ও সংক্রমণকে দায়ী করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, আগে অনেক ক্যানসার শনাক্ত হতো না, তবে বর্তমানে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হন। প্রতি বছর এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১ লাখের বেশি মানুষ। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর ও লিভার ক্যানসার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
তামাক ব্যবহারজনিত কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে জানান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, তামাক ব্যবহারের ফলে দেশে বার্ষিক স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতি কমাতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন এবং তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর কর আরোপের কথা জানান তিনি।
গত বছর প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর ইকুয়িলিটি ইন হেলথ শিরোনামের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীদের গড় বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় পরিবারের মোট আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। এতে বলা হয়, প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার চিকিৎসা চালাতে গিয়ে ঋণ, জমি বিক্রি কিংবা সঞ্চয় ভাঙার ওপর নির্ভর করে এবং অনেকেই সম্পদ বিক্রি করে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন