সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকা এবং মাথার ভেতরে একটানা তীব্র ব্যথা—মাইগ্রেনে ভোগা মানুষের কাছে এটি একটি পরিচিত ও যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। এই শারীরিক অবস্থা মানুষের সম্পর্ক, চাকরি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে নারীরা এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেন আক্রমণের ঝুঁকি তিন গুণ বেশি।
যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা মাইগ্রেন ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত। এটি মূলত একটি জিনগত ও স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা, যা মস্তিষ্ককে বিভিন্ন পরিবর্তনের প্রতি অতি সংবেদনশীল করে তোলে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল মাইগ্রেন সেন্টারের বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাটি মনরোর মতে, কিছু মানুষ এই জিন বহন করলেও তাদের কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাহ্যিক কারণে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট পথ সক্রিয় হয়ে নিউরোকেমিক্যাল নিঃসৃত হয়, যা উপসর্গের শুরু করে।
মাইগ্রেনের উপসর্গের মধ্যে তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং চিন্তার অস্পষ্টতা বা ব্রেন ফগ থাকতে পারে। ডা. মনরো জানান, একজন মানুষের একেকবার একেক রকম উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং বয়সের সাথে সাথে এর পরিবর্তন হতে পারে।

কেবল একটি নির্দিষ্ট কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং ছোট ছোট নানা কারণ জমতে জমতে মানুষের সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করলেই আক্রমণ ঘটে। এর মধ্যে হরমোনের পরিবর্তন, রক্তে শর্করার অনিয়ম, ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক চাপ অন্যতম।
বিশেষ করে দীর্ঘ চাপের পর হঠাৎ শান্ত সময়েও মাইগ্রেনের আক্রমণ হতে পারে। ডা. মনরো বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্ব, অনেক কাজ একসঙ্গে সামলানো এবং মানসিক চাপের কারণে এটি বেশি ঘটে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, আর্দ্রতা এবং পানিশূন্যতার কারণেও এই ব্যথা শুরু হতে পারে।
প্রায় ১০ শতাংশ শিশু মাইগ্রেনে আক্রান্ত হয়, যেখানে ছেলে ও মেয়েদের হার সমান। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে মাসিক চক্র শুরু হওয়ার পর থেকে মেয়েদের আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেড়ে যায়। হরমোনের ওঠানামা এর একটি প্রধান কারণ।

মাসিক শুরুর ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ায় মাইগ্রেনের আক্রমণ বেশি কষ্টদায়ক হয়। পেরিমেনোপজ বা মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগের সময়েও হরমোনের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এটি আরও খারাপ আকার ধারণ করে। মেনোপজের পর হরমোন স্থিতিশীল হলে আক্রমণের তীব্রতা কমে আসতে পারে।
মাইগ্রেন সাধারণত চারটি ধাপে ঘটে। প্রথম ধাপে হাই তোলা বা অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো সতর্ক সংকেত দেখা যায়। দ্বিতীয় ধাপে চোখের সামনে জিগজ্যাগ রেখা দেখা যেতে পারে, যা এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
তৃতীয় পর্যায়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়, যা চার থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। শেষ পর্যায়ে ব্যথা কমে গেলেও শারীরিক ক্লান্তি বা `হ্যাংওভার` ভাব থেকে যায়। এই সময়ে মানুষ স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারলেও পুরোপুরি সুস্থ বোধ করেন না।
মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষজ্ঞরা যতটা সম্ভব নিয়মিত জীবনযাপন বজায় রাখার পরামর্শ দেন। ডা. মনরো আক্রান্তদের নিজেদের জীবনের ধরন খেয়াল করতে বলেন, যাতে তারা বুঝতে পারেন ঠিক কোন কারণে ব্যথার শুরু হচ্ছে। নিয়মিত খাবার খাওয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখা এবং ভালো ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হলেই দ্রুত ওষুধ সেবন করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ব্যথার মাত্রা বাড়ার জন্য অপেক্ষা করেন, যা পরে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বমি প্রতিরোধক ও উপযুক্ত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।
তবে প্যারাসিটামল তুলনামূলক কম কার্যকর এবং কোডিন ব্যথা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২-এর মতো সাপ্লিমেন্ট এবং আকুপাংচার বা যোগব্যায়ামের মতো পদ্ধতিগুলোও প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন