নভেম্বর ৬, ২০২৬, ১০:১০ এএম
মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো নিরাপদ খাদ্য। মুমিনের উচিত, মানুষের এই অধিকার খর্ব হয়, এমন কোনো কাজে আত্মনিয়োগ না করা। কারণ বেঁচে থাকার জন্য মানুষ খাবার খায়, কিন্তু সেই খাবারই যদি মানুষের অসুস্থতা, পঙ্গুত্ব কিংবা মৃত্যুর কারণ হয়, তাহলে তা শুধু ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়; বরং মানুষের জীবন ও অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার নামান্তর। খাদ্যে ভেজাল মেশানো, নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার করা, পচা-বাসি খাবার বিক্রি কিংবা উৎপাদনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সবই জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। অথচ ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই খাদ্যের হালাল হওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ক্ষতিমুক্ত হওয়াও ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
পৃথিবীতে বহু রকম জিনিস মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু মুমিনের জন্য সব খাদ্য গ্রহণ করা হালাল নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের হালাল ও উত্তম খাবার গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে আহার করো।
এই আয়াতে হালাল ও তায়্যিব, দুটি বিষয় একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। হালাল অর্থ শরিয়তসম্মত এবং তায়্যিব অর্থ উত্তম, পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন। অর্থাৎ খাবার শুধু বৈধ হলেই যথেষ্ট নয়; তার গুণগত মান ও পবিত্রতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা এই নির্দেশনার চেতনার পরিপন্থী।
খাদ্যে ভেজাল মেশানো এবং প্রতারণা করা একটি জাতি কিংবা সমাজে দীর্ঘমেয়াদী বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ ব্যাপারে আমাদের প্রিয় নবী অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি স্তূপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন ফলে হাতের আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বললেন, হে স্তূপের মালিক! এ কী ব্যাপার? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! এতে বৃষ্টির পানি লেগেছে। তিনি বললেন, সেগুলো তুমি স্তূপের ওপরে রাখলে না কেন? তাহলে লোকেরা দেখে নিতে পারত। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে, আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
এই হাদিসে লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, এখানে শুধু খাদ্যে ভেজাল নয়, পণ্যের প্রকৃত অবস্থা গোপন করে ক্রেতাকে ঠকানোর বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে। আজকের দিনে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার নতুন মোড়কে বিক্রি, পণ্যের উপাদান গোপন কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার—সবই এই হাদিসের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
হাদিস শরিফে আরও ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।
এই হাদিস প্রমাণ করে, খাদ্যের পবিত্রতা শুধু দেহের বিষয় নয়, মানুষের আত্মিক জীবন ও ইবাদতের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই খাদ্য যেমন হালাল হতে হবে, খাদ্য কেনা বা সংগ্রহের পদ্ধতি ও অর্থও হালাল হতে হবে।
খাদ্য মহান আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত। খাদ্যের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ বীজ থেকে শুরু করে আমাদের পাত পর্যন্ত আসার পেছনে বহু মানুষের শ্রম রয়েছে। খাদ্য অপচয় মহান আল্লাহর নিয়ামতের অবমূল্যায়নের শামিল। মহান আল্লাহ বলেন, হে বনি আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহণ করো। আর খাও এবং পান করো কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।
মনে রাখতে হবে, খাদ্যে ভেজাল দিয়ে মুনাফা অর্জন সাময়িক কিছু অর্থকড়ি এনে দিলেও তা মানুষের জীবন বিপন্ন করে এবং সমাজে অন্যায় ছড়িয়ে দেয়। নিরাপদ খাদ্য কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি মানুষের ন্যায্য অধিকার। মানুষের জীবন রক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন