শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,

পাল্টাপাল্টি হুমকিতে ঝুঁকিতে যুদ্ধবিরতি, বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এপ্রিল ১০, ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

পাল্টাপাল্টি হুমকিতে ঝুঁকিতে যুদ্ধবিরতি, বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদে

ইসলামাবাদে কূটনৈতিক তৎপরতা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজ শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক ঐতিহাসিক ও সরাসরি বৈঠকে বসছে দুই দেশের প্রতিনিধি দল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বিধ্বংসী সংঘাতের পর এই প্রথমবারের মতো দুই পক্ষ সরাসরি আলোচনার টেবিলে একত্রিত হচ্ছে। 

তবে এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলা দুই সপ্তাহের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে লেবানন যুদ্ধবিরতির অংশ কি না—এই প্রশ্নে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার মতবিরোধ ইসলামাবাদের আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইসলামাবাদে আজকের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার। 

পাকিস্তানের মাটিতে এই সরাসরি সংলাপকে সফল করতে পর্দার অন্তরালে গত কয়েক দিন ধরে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে ইসলামাবাদ। ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম জানিয়েছেন, তেহরান প্রস্তাবিত ১০ দফার ভিত্তিতে এই আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে ইরানি জনগণের মধ্যে এই সংলাপের সফলতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। তবুও বৃহত্তর স্বার্থে তেহরান এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যেকোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ইরানের দাবি, লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানও এই যুদ্ধবিরতির অংশ। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। 

নেতানিয়াহু সাফ জানিয়েছেন, যেখানেই হিজবুল্লাহর হুমকি দেখা যাবে, সেখানেই ইসরায়েল হামলা চালাবে। ট্রাম্পও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে লেবানন এই চুক্তির সাথে যুক্ত নয়। পাল্টাপাল্টি এই অবস্থানের কারণে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের অস্ত্রের ট্রিগারে এখনো হাত রয়েছে এবং পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে অন্যদিকে মোড় নিতে পারে।ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে কড়া ভাষায় শাসিয়েছেন। 

তিনি লিখেছেন, যদি কোনো কারণে ইরান চুক্তি মানতে ব্যর্থ হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন শক্তিশালী ও ভয়াবহ হামলা শুরু করবে যা আগে কেউ কখনো দেখেনি। ট্রাম্পের এই হুমকির পাশাপাশি মার্কিন সামরিক জাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলো ইরানি উপকূলের কাছাকাছি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এমন উত্তপ্ত সামরিক ও রাজনৈতিক আবহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মন্তব্য করেছেন যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে। তিনি আরও যোগ করেন, ইরান কোনো অবস্থাতেই লেবাননের জনগণকে একা ছেড়ে দেবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ উত্তেজনার পর এই প্রথমবারের মতো ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ টেলিফোনে কথা বলেছেন। দুই নেতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে এবং উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। উল্লেখ্য যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘাত শুরুর পর এটিই দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সাথে ইরানের এই যোগাযোগ এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি বৈঠক পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে।ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ও কৌশল বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক সময় পাকিস্তানকে এড়িয়ে চললেও বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামাবাদকে এই সংঘাত নিরসনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। 

পাকিস্তানের জন্য এই যুদ্ধ থামানো অত্যন্ত জরুরি, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশটির জ্বালানি আমদানিতে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বেইজিংয়ের পরোক্ষ সমর্থনও এই আলোচনাকে ত্বরান্বিত করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইছহাক দারের সাম্প্রতিক চীন সফর ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বর্তমানে ইসলামাবাদের রাজপথ সরকারি ছুটির কারণে নিস্তব্ধ থাকলেও কূটনৈতিক দপ্তরগুলোতে ব্যস্ততা চরমে। পুরো বিশ্বের যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের নজর এখন পাকিস্তানের এই রাজধানীর দিকে। 

এই আলোচনা সফল হলে কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই থামবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা নিরসনেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। তবে লেবানন ইস্যু এবং ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব শেষ পর্যন্ত এই শান্তি প্রক্রিয়াকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আগামীর কয়েক ঘণ্টা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ইসলামাবাদের বিলাসবহুল একটি হোটেলে দুই দেশের প্রতিনিধিরা তাদের প্রাথমিক বৈঠক শুরু করেছেন।