অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। একই সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিকটবর্তী ইয়েমেনি ভূখণ্ডেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে গোষ্ঠীটি।
বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত এক দশকে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলার মুখেও হুথিদের সামগ্রিক সামরিক শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। এই গোষ্ঠীটি ইরান ও আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও উন্নত সমরাস্ত্রের জোগান পাচ্ছে।
তাদের সামরিক ভাণ্ডারে বর্তমানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন এবং জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্রের বিশাল মজুত রয়েছে। এসব দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম তারা। অপেক্ষাকৃত কম খরচে তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের সংবেদনশীল তেল স্থাপনা ও অন্যান্য প্রধান অবকাঠামোয় লক্ষ্যভেদ করছে বিদ্রোহীরা।
অন্যদিকে এই হামলা ঠেকাতে রিয়াদকে ক্রমাগত চড়া মূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথি যোদ্ধার সংখ্যা ২০১৫ সালের প্রায় ৩০ হাজার থেকে বেড়ে এখন তিন লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। বিদ্রোহীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবহর ছড়িয়ে রেখে বিমান হামলা সামাল দেওয়ার কৌশল রপ্ত করেছে।
সাম্প্রতিক এসব হামলার ফলে সৌদি আরবে প্রাণহানি, বিমান চলাচলে বিপর্যয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিতের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রিয়াদ গ্রহণ করেছিল, তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। তবে বছরের পর বছর চালানো বিমান হামলাতেও এই বাহিনীকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর ২০২৩ সালে গাজা সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ওই সময় লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলা শুরু করে হুথিরা। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আকাশপথে বোমাবর্ষণ করে এই পাহাড়ি বাহিনীকে পরাস্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য সম্মিলিত স্থল অভিযান ও সমন্বিত সামরিক রণকৌশল প্রয়োজন। তবে ইয়েমেনের হুথিবিরোধী স্থানীয় পক্ষগুলোর মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বিভক্তি রয়েছে। অন্যদিকে সরাসরি নতুন কোনো স্থলযুদ্ধে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দৃশ্যমান আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের পথও ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের সৌদি অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহারের শর্তে অনড় রয়েছে হুথি নেতৃত্ব। বিপরীতে রিয়াদের নিরাপত্তা মহলের আশঙ্কা, বিদ্যমান অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নিলে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হবে এবং অঞ্চলে ইরানের কৌশলগত প্রভাব স্থায়ী রূপ পাবে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এই আঞ্চলিক সংকট নিরসনে সামরিক ও কূটনৈতিক উভয় ফ্রন্টেই সৌদি আরব কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন