মার্চ ২৭, ২০২৬, ০৯:৪১ এএম
ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গত বুধবার রাতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে জুলাই হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর মিরপুরে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ফলে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তার সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও শুনানি শেষে মহানগর হাকিম আদালত পাঁচ দিনের সময় মঞ্জুর করেন। ঢাকা মহানগর আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ মামুন খালেদের সরাসরি নির্দেশে গত ১৯ জুলাই মিরপুর এলাকায় পাঁচশ থেকে সাতশ সশস্ত্র ব্যক্তি সাধারণ মানুষের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। প্রাথমিক তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতার পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। শেখ মামুন খালেদ কেবল এই হত্যা মামলাই নয়, বরং বিগত দেড় দশকের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অন্যতম নেপথ্য কারিগর হিসেবে পরিচিত।
বিশেষ করে বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল পর্যন্ত তার ভূমিকা ছিল রহস্যময় ও চাতুর্যপূর্ণ। তার বিরুদ্ধে গোপন বন্দিশিবির বা আয়নাঘর প্রতিষ্ঠা, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদে প্রধান ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে।
মামুন খালেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলারও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী পরিচালিত জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের শত কোটি টাকা লোপাট এবং নিজ আত্মীয়দের নামে একাধিক বেনামি কোম্পানি খোলার অভিযোগ তাকে ঘিরে। এছাড়া ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ের মিডিয়া উইংয়ে কর্মরত থাকাবস্থায় ভিওআইপি ব্যবসা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অঢেল সম্পদ অর্জনের তথ্যও সামনে এসেছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতেও তার নাম জড়িয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক খোলস বদলে ফেলতেন এবং প্রভাব খাটিয়ে শীর্ষ পদগুলো বাগিয়ে নিতেন। ডিজিএফআই প্রধান থাকাকালীন তিনি সংস্থাটিকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আদালতের শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর দাবি করেন যে, শেখ মামুন খালেদ ডিজিএফআইকে একটি ভীতিকর ও নিপীড়ক সংস্থায় পরিণত করেছিলেন। অন্যদিকে, বিবাদী পক্ষ তার রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন জানায়। মামুন খালেদ আদালতকে বলেন যে, তিনি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না এবং অবসরের পর থেকে সাধারণ জীবন যাপন করছেন। তবে আদালত সব পক্ষ শোনার পর মামলার রহস্য উদ্ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
গত মে মাস থেকেই তার ওপর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল এবং তিনি মিরপুরের বাসায় অনেকটা আত্মগোপনের মতো অবস্থায় ছিলেন। তার এই গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও অনেক সাবেক সেনা কর্মকর্তার মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। আগামী কয়েক দিনের রিমান্ডে গত দেড় দশকের গুম, খুন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন