ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কীভাবে পদে টিকে থাকলেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে অপসারণের জোরালো চেষ্টা চললেও বিএনপির শতভাগ সহযোগিতা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনের কারণে তিনি বঙ্গভবনে টিকে ছিলেন।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতিকে নিয়েও যখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখন বিএনপি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছিল।রাষ্ট্রপতির দেওয়া তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেই তাকে সরানোর জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
বিশেষ করে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। রাষ্ট্রপতির দাবি অনুযায়ী, তাকে বিদেশ সফর বা রাষ্ট্রীয় চুক্তি সম্পর্কে অবহিত করা হতো না এবং এমনকি বিদেশি মিশনগুলো থেকে তার ছবি নামিয়ে ফেলার ক্ষেত্রেও তাকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন বঙ্গভবন ঘেরাও করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করছিল, তখন বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে রাষ্ট্রপতির পক্ষে অবস্থান নেয়।বিএনপি কেন একজন আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতিকে রক্ষায় এত সক্রিয় ছিল, তার নেপথ্যে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা তখন প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রপতির পদটি একটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং এই পদে শূন্যতা তৈরি হলে দেশে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেবে যা সাধারণ নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিএনপি তখন যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন চেয়েছিল এবং তারা জানত যে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হলে নির্বাচন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। মূলত এই কারণেই দলটি অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিরোধিতায় সোচ্চার ছিল।রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার সাক্ষাৎকারে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দুঃসময়ে বিএনপির এই অবস্থান তাকে মানসিকভাবে শক্তি যুগিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রাষ্ট্রপতির একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন যেখানে রাষ্ট্রপতি দাবি করেছিলেন যে শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে এক প্রকার দূরত্ব তৈরি হলেও বিএনপির অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির এই বয়ান নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেও এটি স্পষ্ট যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্ষমতার ভারসাম্যে বিএনপির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ কিংবা বিদেশ সফরের পর প্রোটোকল না মানার বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের এই টিকে থাকা এবং পরবর্তীতে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করার পেছনে পর্দার অন্তরালে থাকা রাজনৈতিক সমঝোতা এখন দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়েছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন