এপ্রিল ৫, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের এক-এগারো একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই সময়ের বিরাজনীতিকরণ ও সুশীল সমাজের বিশেষ ভূমিকার সঙ্গে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের এক ধরনের নিবিড় যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা।
অভিযোগ রয়েছে যে, এক-এগারোর সেই তথাকথিত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন বা সমর্থন জুগিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই বর্তমান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন।
দুই ভিন্ন সময়ের এই অনির্বাচিত সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে গণতন্ত্রের সংকোচন এবং বিরাজনীতিকরণের এক অভিন্ন নীলনকশা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বিদায়ী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক-এগারোর অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। তৎকালীন সেনাসমর্থিত সরকারের প্রধান হওয়ার দৌড়ে তার নাম শীর্ষ তালিকায় ছিল এবং মইন উ আহমেদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইউনূস সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন এক-এগারোর সময়কার প্রভাবশালী নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। সেই সময় বিএনপি ভাঙার প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল।
বিশেষ করে তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার অংশকে অযৌক্তিকভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার বিতর্কিত ভূমিকা এখনো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।এক-এগারোর আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব ড. বদিউল আলম মজুমদার বর্তমান সরকারের সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৭ সালেও তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের নামে বিরাজনীতিকরণের পক্ষে জনমত গঠনে সোচ্চার ছিলেন।
তার পাশাপাশি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ অন্তত সাতজন ব্যক্তি এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেছেন, যারা কোনো না কোনোভাবে ২০০৭ সালের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই ব্যক্তিদের মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে সুশীল সমাজ সমর্থিত সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় রাখা।
সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দুটি জাতীয় সংবাদপত্রের ভূমিকাও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক-এগারোর সময় মাইনাস টু ফর্মুলার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এই সংবাদপত্র দুটি গত ১৮ মাসেও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে এবং অনির্বাচিত শাসনের পক্ষে ওকালতি করেছে। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন এবং বিরাজনীতিকরণের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকা অতীতের সেই ‘দুই নেত্রীকে সরে যেতেই হবে’ শিরোনামের সম্পাদকীয়র কথা মনে করিয়ে দেয়। যখনই নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়েছে, তখনই এই গোষ্ঠীটি সংস্কারের দোহাই দিয়ে নির্বাচনের সময়সীমা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা চালিয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ২০০৬ সালে ড. ইউনূসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া ছিল এই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আত্মজীবনীতেও এই পুরস্কারের পেছনে বিশেষ সুপারিশের কথা উল্লেখ রয়েছে। নোবেল পাওয়ার পর ড. ইউনূস যখন ‘নাগরিক শক্তি’ নামে রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন, তখন তার প্রধান সহযোগী ছিলেন একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা নষ্ট করে সংঘাতময় পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এক-এগারোর পটভূমি তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার প্রস্তাব ড. ইউনূস ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই যুক্তিতে যে, দুই বছর তার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। তার পরামর্শেই ফখরুদ্দীন আহমদকে সরকারের প্রধান করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষা ড. ইউনূসের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন গত দেড় বছরের শাসনামলেও দেখা গেছে, যেখানে প্রথম ১০ মাস তিনি নির্বাচনের নাম নিতেও অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপ ও দেশের ভেতরে রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর অবস্থানের মুখে তিনি নির্বাচন দিতে বাধ্য হন।
ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে দেশ যেমন পিছিয়ে গিয়েছিল, তেমনি ইউনূস সরকারের আমলেও অর্থনীতি ও রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন যারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন, তাদের অনেককে ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জনগণ আশা করছে, এই বিচারের মাধ্যমে ২০০৭ সালের সেই কলঙ্কিত বিরাজনীতিকরণ ষড়যন্ত্রের প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক-এগারোর বিচার করতে হলে শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যদের নয়, বরং নেপথ্যে থাকা সুশীল সমাজের কুশীলবদের ভূমিকাও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ হবে এবং গণতান্ত্রিক ধারা সুসংহত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের অধিকার নিরাপদ করতে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন