বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

শিশু পাচার ও অঙ্গহানি চক্র: সাত মাস পর মিলল সন্ধান

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১০:২৭ এএম

শিশু পাচার ও অঙ্গহানি চক্র: সাত মাস পর মিলল সন্ধান

সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে গুরুতর পঙ্গু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়া শিশুটি ফিরে আসার পর দেখা গেছে তার ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে এবং পেটে রয়েছে গভীর অস্ত্রোপচারের দাগ। তাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর পাশাপাশি কোনো অপরাধ চক্র শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করেছে বলে পরিবার অভিযোগ করছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকা থেকে এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে শনাক্ত করেন।

সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর ক্ষতবিক্ষত শরীরে ঘরে ফিরল শিশুটি। উদ্ধার হওয়া শিশুটির ভাষ্য থেকে জানা যায়, বাড়ি থেকে বের হয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পর কিছু তরুণের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে সে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছায়। সেখান থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে চারদিকে বাগানঘেরা একটি আবদ্ধ ঘরে নিয়ে যায়, যেখানে তার মতো আরও অনেক শিশু বন্দি ছিল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে নিজের ডান পা দেখতে না পেলে চক্রের সদস্যরা তাকে ট্রেনে দুর্ঘটনার কথা বলে। এরপর থেকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হতো এবং আয়ের টাকা নির্দিষ্ট পাত্রে জমা নেওয়া হতো। চক্রটির সঙ্গে দুজন পুরুষ ও এক নারী যুক্ত ছিল এবং সেখানে থাকা আরও অনেকেরই হাত-পা কাটা ছিল বলে সে জানিয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, নিখোঁজ হওয়ার সময় আর্থিক অনটনের কারণে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি করা সম্ভব হয়নি। মাহফিল প্রাঙ্গণে স্থানীয় এক বাসিন্দা শিশুটিকে কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিচয় দিতে দেখে পরিবারে খবর দেন। সন্তানের এমন নির্যাতনের বিচার দাবি করে পরিবার জানায়, লোহাগাড়া থানায় অভিযোগ করতে গেলে ঢাকার কমলাপুর সংশ্লিষ্ট এলাকা হওয়ায় সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দিনমজুর বাবার পক্ষে ঢাকায় গিয়ে আইনি লড়াই চালানো কঠিন হওয়ায় তারা প্রশাসনিক সহায়তার আবেদন জানাচ্ছেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনাকে চরম মানবতাবিরোধী বর্বরতা উল্লেখ করে অবিলম্বে চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তবে থানার পুলিশ পরিদর্শকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে আগে কোনো ডায়েরি করা হয়নি। শিশুটি এক মাস কক্সবাজারে থাকার পর ঢাকায় যাওয়ার তথ্য পাওয়ায় তাদের সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রে যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে।

নিখোঁজ থাকার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে পারিবারিক বিরোধের কারণে বাড়ি ছাড়ার কথা শোনা যায়। পরিবারের দাবি, চক্রটির ভয়ে কিংবা তাদের শেখানো কথায় সে ক্যামেরার সামনে ওই বক্তব্য দিয়েছিল।

ঘটনার বিষয়ে মানবাধিকার আইনজীবীরা বলছেন, দেশে নিখোঁজ শিশুদের অঙ্গ কর্তন করে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের মারাত্মক ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও এখনও সন্ধান মেলেনি দুই হাজার ৩৮ জনের, যাদের বেশিরভাগের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। নিখোঁজ শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত জাতীয় সতর্কতা ও কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার কার্যকরের দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।