সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাসিনার শাসনে ৬০০০ গুম

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ১০:১৩ এএম

কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাসিনার শাসনে ৬০০০ গুম

বাংলাদেশে গত ১৫ বছরের শাসনামলে জোরপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যযুক্ত চর্চা। রোববার (৪ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া ‘গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন ভয়াবহ তথ্য।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার হতে পারে।

কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। প্রতিবেদনটিকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে—এটি তার ডকুমেন্টেশন।

প্রতিবেদনের প্রধান ৫টি ভয়াবহ তথ্য:

গুমের পরিসংখ্যান: কমিশনে মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছেন। প্রতি ছয়জনে একজন গুমের শিকার ব্যক্তি আজও নিখোঁজ।

নির্দেশদাতা কে: প্রতিবেদনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গুমের ঘটনার সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

রাজনৈতিক পরিচয়: গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন, তাদের ৭৫% জামায়াত-শিবির এবং ২২% বিএনপির নেতাকর্মী। আর যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের ৬৮% বিএনপি এবং ২২% জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

লাশ গুমের স্পট: তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, বরিশালের বলেশ্বর নদী ছিল লাশ গুমের অন্যতম প্রধান স্পট। গুমের শিকার শত শত ব্যক্তিকে হত্যার পর এই নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ ফেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

দায়ী বাহিনী: অভিযোগের ২৫% ক্ষেত্রে র‍্যাব (RAB), ২৩% ক্ষেত্রে পুলিশ এবং ১৪.৫% ক্ষেত্রে ডিবি (DB) জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিজিএফআই (DGFI) ও এনএসআই-এর নামও উঠে এসেছে, তবে গোপনীয়তার কারণে ভিকটিমরা অনেক সময় তাদের চিনতে পারেননি।

হাইপ্রোফাইল ভিকটিম: প্রতিবেদনে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমন, জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহিল আমান আযমী, মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের গুমের ঘটনাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে গোপনে হস্তান্তর (Rendition) করার তথ্যও প্রমাণসহ উঠে এসেছে।

প্রধান উপদেষ্টা কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা আমাদের মতোই মানুষ। জাতি হিসেবে এই পৈশাচিকতা থেকে আমাদের চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।” তিনি ‘আয়নাঘর’ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের স্থানগুলোর ‘ম্যাপিং’ করার নির্দেশনা দেন।

আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।