মার্চ ২৪, ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে রাজাহার ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক রাজা বিরাট এলাকা। এই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক জনপদে গড়ে ওঠা সাঁওতাল পল্লীতে আজও বেঁচে আছে তাদের শতবর্ষী ঐতিহ্য ও প্রাচীন সারী ধর্ম। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বদলে গেলেও প্রকৃতি ও স্রষ্টার প্রতি নিজেদের আদিম বিশ্বাসকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা।
সাঁওতাল পল্লীতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মাটির দেয়াল আর টিনের চালের পরিপাটি বাড়িঘর। চরম অভাবের মাঝেও তারা তাদের ঘরের দেয়ালে নিপুণ আলপনা ও কারুকাজ করতে ভুলেননি যা তাদের শৈল্পিক মনের পরিচয় দেয়।
তাদের ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো তীর-ধনুক। বাঁশ ও বিশেষ লতা দিয়ে তৈরি এই ধনুক আজও তাদের পশু শিকার ও আত্মরক্ষার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সমাদৃত।সাঁওতালদের আতিথেয়তা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাড়িতে অতিথি এলে কাঁসার থালা ও ঘটিতে জল এনে ভক্তিভরে পা ধুইয়ে দেওয়া তাদের প্রাচীন রীতি।
পা ধোয়ানোর সময় তারা এক মজার অভিনয় করেন যাকে তারা কাঁকড়া ছাড়ানো বলেন। অতিথির পায়ে কাল্পনিক কাঁকড়া আছে বলে তারা দাবি করেন এবং তা ছাড়ানোর বিনিময়ে বকশিশ দাবি করেন। এই আনন্দঘন রীতিটি তাদের সামাজিক বন্ধনের এক অন্যতম অংশ। তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো বাহা পরব। সাঁওতালদের সারী ধর্মে কোনো নির্দিষ্ট মূর্তি বা দেবদেবী নেই। তারা মূলত গাছপালা, জল আর আগুনকেই তাদের পরম শক্তি বা উপাস্য মনে করেন। প্রকৃতি থেকেই মানুষের সব প্রাপ্তি বলে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
শালগাছের নিচে মরেক তুরুই বা সত্যের সন্ধান পাওয়ার বিশ্বাস থেকেই মূলত তাদের এই প্রকৃতি পূজার উদ্ভব। আদিবাসী এই পল্লীর পুরোহিতদের মতে, তাদের চৌদ্দ পুরুষ ধরে এই পূজা চলে আসছে। তারা বিশ্বাস করেন এই পূজার ফলে গ্রাম বসন্ত বা কলেরার মতো মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পায়। পূজার একটি বিশেষ অংশ হলো হাড়িয়া যা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি একটি পানীয়। দেবতাকে এই পানীয় উৎসর্গ করে নারী-পুরুষ সবাই বাঁশি, ধামসা ও মাদলের তালে মেতে ওঠেন উৎসবে।
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের এই আদিম সংস্কৃতি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। তাই হিন্দু বা মুসলিমদের উৎসবের মতো সরকারিভাবে এসব উৎসবেও পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রয়োজন যাতে এই প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়। প্রকৃতিকে ঈশ্বর মেনে সাঁওতালদের এই জীবনবোধ মূলত মাটির কাছাকাছি থাকার গভীর মমতা শেখায়।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন