জুলাই ৫, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি আসর শুরু হতেই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগ উঠতে দেখা যায়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার মতো জনপ্রিয় দলগুলোর গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষ নির্ধারণ কিংবা লিওনেল মেসির হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার জন্য পুরো সূচি আগে থেকেই গোপনে সাজানো থাকে বলে অনেক ফুটবলপ্রেমী দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডায় এই ধরনের বিতর্ক প্রতিনিয়ত চললেও ফুটবলীয় সমীকরণ এবং বাস্তব নিয়মকানুন বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে কোনো যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিশ্বমঞ্চের এই মহাযজ্ঞের দল বিন্যাস এবং নকআউট পর্বের পথ নির্ধারণের পেছনে কাজ করে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বচ্ছ পদ্ধতি।মাঠের খেলায় কোনো পূর্বপরিকল্পিত নকশা বাস্তবায়ন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের দল নির্ধারণের জন্য যে ড্র অনুষ্ঠিত হয়, তার একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম রয়েছে। ফিফার তৎকালীন বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ওপর ভিত্তি করে অংশগ্রহণকারী আটচল্লিশটি দলকে মোট চারটি ভিন্ন বাকেটে বা পাত্রে ভাগ করা হয়।
প্রথম বাকেটে থাকে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ বারোটি দল, যার মধ্যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল বা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলগুলো স্থান পায়। এরপরের তুলনামূলক কম র্যাংকিংয়ের দলগুলোকে দ্বিতীয়, третий ও চতুর্থ বাকেটে ক্রমান্বয়ে বণ্টন করা হয়। ড্র পরিচালনার সময় প্রতিটি বাকেট থেকে লটারির মাধ্যমে একটি করে দল নিয়ে একেকটি গ্রুপ সাজানো হয়, যাতে গ্রুপ পর্বেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলো একে অপরের মুখোমুখি না হয়ে যায়।
গ্রুপ পর্বের ড্রয়ের দিনই পুরো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ছক বা ম্যাপ চূড়ান্ত করে ফেলা হয়। ফিফা আগে থেকে কখনোই জানতে পারে না যে কোন গ্রুপ থেকে কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে আর কারা রানারআপ হিসেবে পরের পর্বে যাবে। যদি কোনো বড় দল গ্রুপ পর্বে অঘটন ঘটিয়ে দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়, তবে তাদের নকআউট পর্বের শুরুতেই অন্য কোনো গ্রুপের শক্তিশালী চ্যাম্পিয়ন দলের মুখোমুখি হতে হয়। অতীতে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের মতো দলগুলো যদি নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে না পারত, তবে রাউন্ড অব বত্রিশ বা ষোলোর পর্বেই তাদের স্পেনের মতো কঠিন প্রতিপক্ষের মুখে পড়তে হতো, যা তাদের আসর থেকে ছিটকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করত।
বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলেও ফিফার পক্ষে লাতিন আমেরিকার কোনো দেশকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ফিফার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ও স্টেকহোল্ডার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন স্বত্ব এবং বিভিন্ন কর্পোরেট স্পনসরশিপ কোম্পানি। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় অঞ্চলের দেশগুলো ফুটবল বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, কারণ সেখানে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ দুই-ই সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়িক মুনাফার স্বার্থে ফিফা যদি কাউকে অলিখিতভাবে সহায়তা করতেও চায়, তবে লাতিন আমেরিকার পরিবর্তে ইউরোপের কোনো পরাশক্তি বা ইংল্যান্ডের মতো দেশকে পক্ষপাত করা তাদের জন্য অনেক বেশি লাভজনক হতো। কারণ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সেই পরিমাণ আর্থিক ক্ষমতা বা বাজার কাঠামো নেই যা ফিফার রাজস্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
চলতি বিশ্বকাপের নতুন কাঠামোতে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে আটচল্লিশটি করায় নকআউট পর্বের সমীকরণ আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এখন বারোটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুটি দল সরাসরি পরের পর্বে যাওয়ার পাশাপাশি তৃতীয় স্থানে থাকা বারোটি দলের মধ্য থেকে সেরা আটটি দলকে বাছাই করা হয়। এই চব্বিশ এবং আট দল মিলে প্রথমবারের মতো রাউন্ড অব বত্রিশ দলের একটি অতিরিক্ত নকআউট পর্ব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফিফা এই বাড়তি ম্যাচের আয়োজন করেছে মূলত টিকিট বিক্রি এবং সম্প্রচার স্বত্ব থেকে নিজেদের আয় সর্বোচ্চ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই তৃতীয় স্থানের সেরা দলগুলো কেবল পয়েন্ট দিয়ে নির্ধারিত হয় না, সেখানে গোল ব্যবধানের মতো জটিল গাণিতিক হিসাব জড়িত থাকে। কোনো দল কত গোল দেবে বা খাবে, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা কোনো সংস্থার পক্ষে অলৌকিক উপায়েও সম্ভব নয়।
বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত ক্রীড়া সংস্থাগুলোর একটি হিসেবে ফিফার বিরুদ্ধে অনেক ঐতিহাসিক অভিযোগ রয়েছে। টিকিটের দাম নির্ধারণ, কালোবাজারি পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ কিংবা কোন দেশ বিশ্বকাপের আয়োজক হবে তা নিয়ে পর্দার আড়ালের লবিং ও বিপুল অর্থ লেনদেনের ঘটনায় ফিফার কর্মকর্তাদের নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। এমনকি খেলা চলাকালীন বাণিজ্য বাড়াতে প্রথমার্ধে ও দ্বিতীয়ার্ধে তিন মিনিট করে অনিয়মিত বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্তও কেবল বিজ্ঞাপনী রাজস্ব আদায়ের জন্য করা হয়েছে বলে তীব্র সমালোচনা চলছে। তবে মাঠের বাইরের এই বিপুল দুর্নীতি ও বাণিজ্যিক অনিয়ম করলেও মাঠের ভেতরের খেলা সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষমতা বা সাহস ফিফার নেই।
আধুনিক ফুটবলে হাজার হাজার উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি ব্যবস্থা এবং শত শত ম্যাচ অফিশিয়ালের সার্বক্ষণিক নজরদারি এড়িয়ে দিনের আলোতে কোটি মানুষের সামনে ম্যাচ পাতানো একেবারেই অবাস্তব। মাঠের খেলায় কৃত্রিমভাবে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করলে দীর্ঘমেয়াদে ফুটবলের বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে, যা ফিফার নিজস্ব বিলিয়ন ডলারের ব্যবসাকেই চিরতরে বন্ধ করে দেবে। খেলোয়াড় বা দল সময়ের সাথে পরিবর্তিত হলেও ফুটবলের বৈশ্বিক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে মাঠের স্বচ্ছতা বজায় রাখা ফিফার নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই সবচেয়ে জরুরি। সূচির এই জটিল সমীকরণগুলো সম্পূর্ণভাবে দৈবচয়ন এবং খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন