রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৮ বালক কাবাডি দলের ইতিহাস

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৫:০০ পিএম

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৮ বালক কাবাডি দলের ইতিহাস

ছবি - সংগৃহীত

বাহরাইনে অনুষ্ঠিত যুব এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য বড় সুখবর এলো। দুই দিন আগেই নারী কাবাডি দল পদক জয়ের মাধ্যমে যে সাফল্যের সূচনা করেছিল, সেই ধারা অব্যাহত রাখল পুরুষ কাবাডি দলও। মেয়েদের দেখানো পথ অনুসরণ করে ছেলেরাও দেশকে এনে দিল গৌরব। স্বাগতিক বাহরাইনকে টুর্নামেন্টের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে আক্ষরিক অর্থেই উড়িয়ে দিয়ে আসরের ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের তরুণেরা।

এই জয়ের ফলে এবারের যুব এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক সংখ্যা দাঁড়ালো দুটিতে, যা দেশের যুব ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দেশের জাতীয় খেলা কাবাডি থেকে আসা এই জোড়া পদক বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

বুধবার বাহরাইনের ঈসা স্পোর্টস সিটিতে অনুষ্ঠিত এই ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইটি ছিল সম্পূর্ণ একপেশে। স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাহরাইন ঘরের মাঠে দর্শকদের সামনে কিছুটা প্রতিরোধ গড়বে বলে ধারণা করা হলেও, বাংলাদেশের তরুণ কাবাডি খেলোয়াড়দের অদম্য গতি, রেইডিং এবং জমাট প্রতিরক্ষার সামনে তারা দাঁড়াতেই পারেনি। শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে বাংলাদেশ একের পর এক পয়েন্ট সংগ্রহ করতে থাকে। প্রথমার্ধেই বাংলাদেশের বড় ব্যবধানের লিড জয়ের আভাস দিচ্ছিল।

দ্বিতীয়ার্ধেও সেই দাপট অব্যাহত থাকে। ম্যাচের চূড়ান্ত বাঁশি বাজার সময় স্কোরবোর্ডে ফলাফল ছিল বাংলাদেশের পক্ষে ১০৬ এবং বাহরাইনের পক্ষে মাত্র ১৭। প্রায় ৯০ পয়েন্টের এই বিশাল ব্যবধানের জয়ই প্রমাণ করে ব্রোঞ্জ পদকের জন্য কতটা মরিয়া এবং প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশ দল। স্বাগতিকদের তাদেরই মাঠে এভাবে পর্যুদস্ত করা বাংলাদেশের জন্য ছিল একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।

বাংলাদেশের জন্য এবারের যুব এশিয়ান গেমসের এই সাফল্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এর আগের দুটি যুব আসরে অংশগ্রহণ করেও বাংলাদেশকে প্রতিবারই ফিরতে হয়েছিল শূন্য হাতে, কোনো পদকের দেখা মেলেনি। সেই দীর্ঘ খরা কাটিয়ে এবার তৃতীয় আসরে এসেই জোড়া পদকের দেখা পেল বাংলাদেশ এবং দুটি পদকই এলো দেশের জাতীয় খেলা কাবাডি থেকে।

এটি প্রমাণ করে, বয়সভিত্তিক খেলাধুলায় বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে এবং কাবাডিতে যে দেশটির একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। এবারের আসরে ছেলেদের কাবাডি ইভেন্টে মোট সাতটি দল অংশ নিয়েছিল। শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের ভিড়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সাফল্য।

তবে আসর শেষ করে তৃতীয় হওয়ার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না বাংলাদেশের জন্য। টুর্নামেন্টের শুরুটা হয়েছিল একরাশ হতাশা দিয়েই। প্রথম ম্যাচেই কাবাডির বিশ্বশক্তি ও এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে অভিজ্ঞতার অভাবে এবং প্রতিপক্ষের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে পাত্তাই পায়নি লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ভারতের কাছে ৮৩-১৯ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে হার দিয়ে আসর শুরু হয় বাংলাদেশের।

এমন একটি বড় পরাজয়ের পর দলের মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণেরা সেখানেই তাদের দৃঢ়তার পরিচয় দেন।ভারতের কাছে হারের সেই ধাক্কা সামলে বাংলাদেশ দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় পরের দুই ম্যাচেই। দ্বিতীয় ম্যাচে তারা মুখোমুখি হয় আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইরানের।

সেই রুদ্ধশ্বাস ও উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ৫৫-৪৮ ব্যবধানে ইরানকে হারিয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের আগমনী বার্তা দেয়। কাবাডিতে ইরানকে হারানো সব সময়ই একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়েই পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলতে নামে বাংলাদেশ এবং সেই ম্যাচেও ৫৩-৪০ ব্যবধানের দাপুটে জয় তুলে নেয়।

টানা দুই জয়ে যখন ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল দল, তখনই মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতে হয় তাদের। শক্তিশালী থাইল্যান্ডের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ৮৯-৪২ ব্যবধানে হেরে বসে বাংলাদেশ। এই হারটিই তাদের ফাইনালের দৌড় থেকে ছিটকে দেয় এবং ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করে।ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গ হলেও পদক জয়ের আশা তখনও বেঁচে ছিল বাংলাদেশের। শেষ দুই ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য হয়ে দাঁড়ায় সম্মান রক্ষার লড়াই এবং নিজেদের প্রমাণের মঞ্চ।

সেই লড়াইয়ে বাংলাদেশ প্রথমে আরেক প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানকে ৫৬-২৯ ব্যবধানে পরাজিত করে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের টিকিট প্রায় নিশ্চিত করে ফেলে। আর আজ, সেই চূড়ান্ত লড়াইয়ে স্বাগতিক বাহরাইনকে কোনো সুযোগ না দিয়েই উড়িয়ে দিয়ে ছিনিয়ে আনলো কাঙ্ক্ষিত ব্রোঞ্জ পদক।

এর আগে নারী কাবাডি দলও তাদের ইভেন্টে দেশকে প্রথম পদকটি এনে দিয়েছিল। যদিও এবারের আসরে অন্য কোনো ইভেন্ট থেকে এখনো কোনো পদক আসেনি, তবে কাবাডির এই জোড়া সাফল্যই বাহরাইন গেমসে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। জাতীয় খেলা কাবাডিতে তরুণ প্রজন্মের এই ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিচর্যা, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাবাডিই হতে পারে বাংলাদেশের পদক জয়ের প্রধানতম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।