এপ্রিল ৫, ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
খুলনাঞ্চলের উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে এবার রসালো ফল তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় মাঠজুড়ে এখন কেবল তরমুজের সমারোহ। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এই অঞ্চলে এবার প্রায় ৭২৩ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রির এক বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা না দিলে এই লক্ষ্যমাত্রা সহজেই অর্জিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রান্তিক চাষিরা।
চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের রবি মৌসুমে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল জেলায় তরমুজ আবাদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। যদিও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি তবে ফলন ভালো হওয়ায় লাভের অংক ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে এই চার জেলায় ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু খুলনা জেলাতেই ১৩ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছে যা এই অঞ্চলের প্রধান উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রতি বিঘা জমিতে এবার গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০টি তরমুজ উৎপাদিত হয়েছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো।
বর্তমান বাজার দর ও সম্ভাব্য চাহিদা অনুযায়ী প্রতি বিঘার তরমুজ অন্তত ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে একজন কৃষক বিঘা প্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ করতে পারবেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে মোট উৎপাদন খরচ যেখানে ৩১০ কোটি টাকার কিছু বেশি সেখানে সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্য ধরা হয়েছে ৭২৩ কোটি টাকার ওপরে। এতে পুরো অঞ্চল থেকে লাভ আসতে পারে প্রায় ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
বিগত অর্থবছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই অঞ্চলের তরমুজ চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া এবং খরার প্রভাবে ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক এ বছর চাষাবাদে কিছুটা অনীহা দেখিয়েছেন। এ কারণেই মূলত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ হাজার ২৪৫ হেক্টর কম জমিতে আবাদ হয়েছে। তবে যারা আবাদ করেছেন তারা এখন ফলন দেখে বেশ আনন্দিত। খুলনার বাজুয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা এবং মোংলার বানিয়াশান্তর মতো এলাকাগুলো তরমুজ উৎপাদনে এবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দাকোপ উপজেলার কৈল্লাশগঞ্জ ইউনিয়নের হরিণটানা ব্লকের কৃষক ইন্দ্রজিৎ জানান তিনি এবার কয়েক বিঘা জমিতে তরমুজ বুনেছেন। ফলন বেশ ভালো হয়েছে এবং প্রতি বিঘাতে আট থেকে নয়শ পিস তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে। বড় কোনো শিলাবৃষ্টি বা কালবৈশাখী ঝড় না হলে এবার তিনি ভালো লাভের মুখ দেখবেন বলে আশাবাদী। একই অঞ্চলের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন তারা কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন। পোকা দমনের জন্য সেক্সফেরোমন ফাঁদ এবং হলুদ আঠালো ফাঁদ স্থাপনের মাধ্যমে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন খুলনাঞ্চলের মধ্যে দাকোপে সবচেয়ে বেশি তরমুজের আবাদ হয়। গত বছরের লোকসানের রেশ থাকলেও এবার কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক সময়মতো সরবরাহ করা হয়েছে। এখন কৃষকরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিন পর থেকেই মাঠ থেকে তরমুজ তোলা শুরু হবে।খুলনা অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম মনে করেন গত বছরের তুলনায় আবাদি জমি কমলেও ফলনের গুণগত মান বেশ ভালো।
তিনি উল্লেখ করেন যদি আগামী কয়েক সপ্তাহ আবহাওয়া স্থিতিশীল থাকে এবং কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড় বা শিলাবৃষ্টি না হয় তবে এই অঞ্চলের উৎপাদিত তরমুজ দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের অবদান রাখবে। উপকূলীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে এই রসালো ফলটি এখন অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই বিশাল বাণিজ্যের হাতছানি স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন