অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৭:১২ পিএম
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় কাইনমারা খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার হাত ধরে উপকূলীয় কৃষিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। লবণাক্ততা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে যেসব জমিতে আগে বছরে কেবল একবার আমন মৌসুমে বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে একটি মাত্র ধান চাষ হতো, সেখানে এখন একই সাথে ধান, মাছ ও হরেক রকমের শাকসবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এক ফসলি অনাবাদি প্রান্তর এখন রূপ নিয়েছে বহুফসলি সমৃদ্ধ সবুজ খামারে।
ডুমুরিয়ার এই বিস্তৃত বিলে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দেখা দিত এবং লবণাক্ততার প্রভাবে চারপাশের জমি খাঁ খাঁ মরুভূমির মতো পড়ে থাকত। কৃষকরা জানান, বর্ষাকালে তৈরি করা ধানের বীজতলা অতিরিক্ত পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায়ই নষ্ট হয়ে যেত। এতে প্রতি বছর কৃষকদের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হতো এবং দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতে হতো।
পরিস্থিতি বদলাতে ২০২৩ সালে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার ‘সফল’ প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় কাইনমারা খালের পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে খালটি পুনঃখনন করার পর থেকেই মিষ্টি পানির স্থায়ী আধার তৈরি হয়।
কৃষকরা এখন সমতল জমি কেটে পরিকল্পিত ঘের তৈরি করেছেন। এই ঘেরের মাঝের সমতল জমিতে চাষ হচ্ছে বিআর-২৩ জাতের জলবায়ুসহিষ্ণু ও লবণসহিষ্ণু আমন ধান। একই সঙ্গে উন্নতমানের বীজধান উৎপাদন করে তা অন্যান্য কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। ঘেরের ভেতরের ক্যানালে চলছে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ।
অন্যদিকে ঘেরের উঁচু মাটির পাড় ও মাচায় বারো মাস ফলানো হচ্ছে বরবটি, শিম, করলা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া ও তরমুজ। জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে গোবর ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করছেন চাষিরা। গাছে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে কেবল সপ্তাহে একদিন নিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক স্প্রে করা হয় এবং ওষুধ প্রয়োগের অন্তত চার দিন পর নিরাপদ সবজি বাজারে তোলা হয়। উৎপাদিত সবজি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি মধ্যস্থতাকারী কৃষি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।
পাইকাররা সরাসরি ঘেরের পাড়ে এসে প্রতি কেজিতে এক থেকে দুই টাকা কমিশন রেখে কৃষকদের পণ্য কিনে নিচ্ছেন। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। তবে ভরা মৌসুমে উৎপাদন অনেক বেড়ে গেলে সবজির বাজারদর কিছুটা কমে যায়। কৃষকদের দাবি, এলাকায় সবজি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার সুবিধা থাকলে তারা আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন।
খালটির স্থায়িত্ব ও পানি বণ্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় ১০টি গ্রামের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয়েছে। ১০টি গ্রামকে কেন্দ্র করে গঠিত ১০টি কৃষক দলের মাধ্যমে পুরো এলাকা পরিচালনা করা হচ্ছে, যার আওতায় রয়েছে এক হাজার ১৬০টি কৃষক পরিবার। খালের সীমানাসংলগ্ন সুবিধাভোগী জমিমালিকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা এবং দূরবর্তী কৃষকদের কাছ থেকে ৫০ টাকা চাঁদা নিয়ে একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে সেই তহবিলে প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার ৩০০ টাকা জমা হয়েছে। খাল বা বাঁধে কোনো ধরনের মেরামত, নতুন পাইপ বসানো বা অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হলে এই জমানো অর্থ থেকেই ব্যয় মেটানো হয়। পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও চালু হয়েছে অভিনব পাইপলাইন পদ্ধতি। খালের সাথে প্রতিটি জমির সংযোগ পাইপ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে।
ফসলে পানির প্রয়োজন হলে পাইপ খুলে সেচ দেওয়া হয় এবং জমিতে পানি বেশি হলে তা পুনরায় বিপরীতমুখী পাইপের মাধ্যমে খালে নামিয়ে নিষ্কাশন করা হয়। ফলে জমিতে ক্ষতিকর জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে না। উৎপাদিত ফসল দ্রুত বাজারে পাঠাতে কৃষকরা খালটিকে ছোট নৌকার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ পরিবহন পথ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।
প্রকল্পের সমন্বয়কারীরা জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল ও যশোরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা কৃষির প্রধান অন্তরায়। কৃষকদের এই সংকট কাটাতে ২০০ থেকে ৪০০ হেক্টর জমিকে নির্দিষ্ট ব্লকে ভাগ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের এক ছাতার নিচে আনা হয়েছে।
সমগ্র অঞ্চলে এ পর্যন্ত ৯১টি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের নির্ভরতা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, যা কৃষকদের সেচ খরচ ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সাথে সংযোগ ঘটিয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ ও সরাসরি বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন