অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
একসময় গরিব মানুষের পরিচিত খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল কলার মোচা ও থোড়। আধুনিক যুগে ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ভিড়ে পুষ্টিকর এই খাবারগুলো একসময় আড়ালে চলে গিয়েছিল এবং অনেকেই এগুলো ফেলেও দিতেন। তবে সময়ের সাথে সাথে আবারও সবজির বাজারে বেশ জোরালো জায়গা করে নিচ্ছে কলার মোচা ও থোড়। এমনকি শৌখিন ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিচ্ছে এই খাবার। বর্তমানে দিনাজপুরের বিভিন্ন বাজারে কলার মোচা ও থোড় নিয়মিতভাবে বিক্রি হচ্ছে।
এগুলোর দামও সাধারণ মানুষের সম্পূর্ণ নাগালের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে প্রতি পিস মোচা বা থোড় ২০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজার, চকবাজার, রেলবাজার, চৌরঙ্গী বাজার, নিউটাউন বাজার, পুলহাট, রূপম মোড় ও হাউজিং মোড়সহ জেলার ৬৪টি হাট ও বিভিন্ন মোড়ে এই সবজি বিক্রি হতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার এক হাজার ২৫৯ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। ফলে কলার মোচা ও থোড় সংগ্রহ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না এবং জেলার সর্বত্রই এগুলো পাওয়া যায়। পুষ্টিবিদদের মতে, কলার মোচা ও থোড়ের তরকারি অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দূর করতে দারুণ কার্যকরী।
এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে, যা রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার ফাইবার বা আঁশ, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে দেয় না। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি আদর্শ সবজি হিসেবে বিবেচিত হয়। মোচার ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি কলার থোড়ের রস কিডনির পাথর প্রতিরোধে এবং লিভার সুস্থ রাখতেও ভূমিকা রাখে। এতে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম অথচ পেট অনেকক্ষণ ভরিয়ে রাখে, যা ওজন কমানোর জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এছাড়া এতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদযন্ত্র ভালো রাখে।
অনেকেই কলার মোচা ও থোড়কে একই জিনিস মনে করে গুলিয়ে ফেলেন, অথচ দুটি কলাগাছের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অংশ।
মোচা হলো মূলত কলাগাছের ফুল। কলার ছড়া বের হওয়ার আগে বা পরে যে গাঢ় লাল-বেগুনি রঙের অংশটি ঝুলে থাকে, সেটাই মোচা। অন্যদিকে, কলার থোড় হলো কলাগাছের ভেতরের নরম সাদা মজ্জা বা কাণ্ড। কলাগাছ কেটে ফেলার পর তার ভেতরের আঁশযুক্ত অংশটি বের করে খাওয়ার উপযোগী করা হয়। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী রান্নাঘরে মোচা ও থোড় দিয়ে চমৎকার সব মুখরোচক পদ তৈরি করা হয়। এর মধ্যে কলার মোচার ঘণ্ট বেশ জনপ্রিয়। এটি চিংড়ি মাছ, ডালনা বা গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে তৈরি অন্যতম সেরা একটি বাঙালি পদ। এছাড়া বিকেলের নাশতার জন্য মোচা সেদ্ধ করে বেশন ও মশলা মিশিয়ে চমৎকার চপ বা কাটলেট তৈরি করা যায়। কালোজিরা, কাঁচামরিচ ও নারিকেল কোড়া কিংবা চিংড়ি মাছের শুঁটকি দিয়ে থোড় ভাজিও অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার। অনেকে ডাল ও ডিম দিয়েও এটি রান্না করে থাকেন, আবার কেউ কেউ খালি পেটে থোড়ের রস জুস হিসেবেও পান করেন।
দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারে মোচা ও থোড় বিক্রির জন্য নিয়ে আসা বিক্রেতা এজামুল হক জানান, জেলার সব উপজেলায় ব্যাপক হারে কলা চাষ হওয়ায় আগে বাগানগুলোতে গিয়ে বিনা পয়সায় এগুলো এনে বিক্রি করা হতো।
তবে থোড় গাছ কেটে বের করা কিছুটা কঠিন হওয়ায় এখন এগুলো বিনা মূল্যেই সংগ্রহ করা যায়। অন্যদিকে, মোচা ৩ থেকে ৫ টাকা পিস হিসেবে কিনে এনে সময়ভেদে বাজারে ১০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় বিচি কলার (আঠিয়া কলা) মোচা, তবে এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হওয়ায় বাজারে একটু কম পাওয়া যায়। তিনি প্রতিদিন তিন থেকে চারশ পিস মোচা এবং এক হাত লম্বা থোড় ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন। আরেক বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, দুই বছর আগে যখন তিনি প্রথম মোচা ও থোড় বাজারে নিয়ে আসতেন, তখন অনেকেই লজ্জায় কিনতে চাইতেন না। বিশেষ করে থোড় কেনার সময় ক্রেতারা ডানে-বাঁয়ে তাকাতেন কেউ দেখছে কি না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে, ক্রেতারাই বরং তাকে খুঁজে নেন এবং পরের দিন কখন আসবেন তা জিজ্ঞেস করেন।
নিয়মিত থোড় ও মোচা কিনে খাওয়া দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের স্টাফ আনোয়ার সাদাত মানিক জানান, আয়রন ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এবং পেট পরিষ্কার রাখায় তিনি নিয়ম করে থোড় কিনে খান। তাঁর বাসায়ও এটি অত্যন্ত পছন্দ করা হয়। তিনি চিংড়ি মাছ, ডিম, শুঁটকি ও ডাল দিয়ে থোড় রান্না করে খাওয়ার পাশাপাশি মোচা ও আলু সেদ্ধ করে রান্না করার কথা জানান। নিয়মিত ক্রেতা মো. আলম জানান, তাঁরা শুঁটকি-ডাল ও ডিম দিয়ে থোড়-মোচা রান্না করে খান। রক্তস্বল্পতায় ভোগা লিমন হোসেন বলেন, শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণ ও রক্ত বাড়াতে তিনি নিয়মিত মোচা ও থোড় খাচ্ছেন। কাহারোল উপজেলার সবজি ব্যবসায়ী মো. আলী জানান, তিনি বিভিন্ন ধরনের সবজির পাশাপাশি ইদানীং ঢাকায়ও মোচা ও থোড় পাঠাচ্ছেন এবং রাজধানী শহরেও এই দুই সবজির বেশ ভালো চাহিদা তৈরি হয়েছে। সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা এলাকার কৃষক জুয়েল ইসলাম জানান, আগে তাঁরা মোচা ফেলে দিতেন এবং থোড় পচে যেত, অথচ এখন মোচা কেনার জন্য মানুষ দল বেঁধে আসে। দিন দিন এর চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সামনের দিনগুলোতে এর কদর আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ড. সি রায় বলেন, মোচা ও থোড় দুটিই সম্পূর্ণ নির্ভেজাল সবজি। এগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে দারুণ সাহায্য করে। থোড় ধীরে হজম হওয়ায় অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগে না। এটি পুষ্টিগুণ ও আয়রনে ভরপুর নিরাপদ খাবার, যাতে কোনো কীটনাশক থাকে না। সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা মোসোদ্দেক হোসেনের মতে, দিনাজপুরে ব্যাপক হারে কলার চাষ হওয়ার কারণে মোচা ও থোড়ের কোনো অভাব নেই। এই খাবারকে সঠিকভাবে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে নষ্ট হয়ে যাওয়া এই অংশ মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য চাহিদা মেটাতে অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান জানান, আগে মানুষ চাষের কলার মোচা ও থোড় খেতে চাইত না, কিন্তু এখন বাজারে এগুলো নিয়মিত বিক্রি হয়। সাধারণ ফেরিওয়ালারাও এখন মোচা ও থোড় বিক্রি করছেন। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভাসে এটিকে স্থায়ীভাবে জায়গা করে দেওয়া গেলে তা যেকোনো সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন