মার্চ ৩০, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল নারায়ণপুর ইউনিয়নের এক সাধারণ যুবক মো. তাইজুল ইসলাম। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রির সহকারী বা হেলপার হলেও বর্তমানে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। অভাব-অনটন আর মানুষের অবহেলাকে সঙ্গী করে বড় হওয়া এই যুবক এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক পরিচিত মুখ।
জীবনের রূঢ় বাস্তবতা থেকে ক্ষণিকের মুক্তি পেতে এবং নিজের এলাকার দুঃখ-দুর্দশার কথা সবার সামনে তুলে ধরতেই তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন মোবাইল আর একটি প্রতীকী মাইক্রোফোন।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় তাইজুল ইসলামের জীবন সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। তার বাবা ও মা দুজনেই শ্রবণ প্রতিবন্ধী। নিজের কোনো জমি বা ভিটেমাটি না থাকায় অন্যের জায়গায় ঝুপড়ি ঘর তুলে তারা বসবাস করেন। মা রাস্তায় মাটির কাজ করেন এবং তাইজুল ঢাকার বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিকের কাজ করে পরিবারের ঘানি টানেন।
অভাবের এই সংসারে একটু হাসির খোরাক জোগাতে এবং নিজের অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের দাবিগুলো সরকারের নজরে আনতে তিনি মজার সব ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করেন। সম্প্রতি মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জিলাপি বিক্রি নিয়ে তার একটি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দেখেছেন।সেই ভিডিওতে তাইজুলকে দেখা যায় স্থানীয় একটি দোকানে গিয়ে দোকানিকে ‘সরকারি রেটে’ জিলাপি বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করতে। অত্যন্ত সহজ-সরল ঢঙে করা তার এই ভিডিওটি সারাদেশে যেমন বিনোদন জুগিয়েছে, তেমনি অনেককে ভাবিয়েও তুলেছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ তার এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও অনেকেই তাকে নিয়ে বিদ্রূপ বা ট্রল করতে ছাড়ছেন না। তবে এসবে দমে যাওয়ার পাত্র নন তাইজুল। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে নিজের মনের কষ্ট ভুলতে এবং মানুষের অবহেলাকে আড়াল করতেই তিনি এই ভিডিওগুলো বানান।তাজুর এই ভিডিও বানানোর নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা। তার এলাকা নারায়ণপুর অত্যন্ত দুর্গম, যেখানে পৌঁছাতে চারটি নৌঘাট পাড়ি দিতে হয়। দুর্গম পথ হওয়ার কারণে মূলধারার সাংবাদিক বা প্রশাসনের কেউ সহজে সেখানে যান না।
তাইজুল নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন না, তবে তিনি চান তার ভিডিওর মাধ্যমে এলাকার সমস্যাগুলো যেন গণমাধ্যম ও প্রশাসনের নজরে আসে। তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন হয়তো তার এই ভিডিওগুলোই বদলে দেবে তার ভাগ্য এবং তার এলাকার মানুষের জীবনমান।পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাইজুলের কাঁধে রয়েছে বিশাল দায়িত্ব।
তার বাকি ভাইবোনেরা পড়াশোনা করছে এবং তাদের খরচও তাকেই জোগাতে হয়। ঢাকায় তিন-চার মাস হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন গান-বাজনার দলের সঙ্গে সময় কাটান এবং ভিডিও তৈরিতে মনোযোগ দেন। তাইজুল বলেন যে তাকে নিয়ে যারা ব্যঙ্গ করেন তাদের ওপর তার কোনো ক্ষোভ নেই। তার একমাত্র লক্ষ্য হলো চরাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের উন্নয়ন এবং নিজের পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটানো। একজন রাজমিস্ত্রির সহকারীর এই অদম্য ইচ্ছা ও সাহসিকতা এখন প্রশংসিত হচ্ছে সারাদেশে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন