সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম
রাজধানী ঢাকার অসহনীয় যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট উচ্ছেদসহ একগুচ্ছ জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সাথে নগরীর যেকোনো সড়কে উন্নয়নকাজ শুরুর আগে ট্রাফিক বিভাগের আনুষ্ঠানিক মতামত ও অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা ও জরিমানা আরোপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব কঠোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই সমন্বয় সভায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সেবা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে মতামত দেন।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীর সব অবৈধ ব্যাটারি ও যানবাহন চার্জিং পয়েন্টের তালিকা তৈরি করে নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। বিশেষ করে প্রধান বৈদ্যুতিক লাইন থেকে হুকের মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ নিয়ে যেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যানবাহন চার্জ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বিদ্যুৎ বিভাগকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অভিযানের অগ্রগতি এবং গৃহীত প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়মিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে অবৈধভাবে পরিচালিত বিভিন্ন কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাস্তা খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা বন্ধে নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, অনেক উন্নয়ন সংস্থা কাজ শুরুর মাত্র দুই-তিন দিন আগে ট্রাফিক বিভাগকে দায়সারাভাবে অবহিত করে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই রাস্তা খনন শুরু করা হয়। এর ফলে বিশেষ করে শাখা সড়ক ও সার্ভিস লেনগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হয়ে মানুষের চরম দুর্ভোগ হয়। এই পরিস্থিতি বন্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে রাস্তা খননের যেকোনো অনুমতি চূড়ান্ত করার আগে ট্রাফিক বিভাগের মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়েছে।
আবেদনের সাথে বিশদ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, কাজের সময়সূচি এবং ট্রাফিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হবে। কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের সাথে যৌথভাবে নির্মাণস্থল পরিদর্শন করা বাধ্যতামূলক। প্রধান সড়কে কাজ শুরুর আগে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগকে অবহিত করতে হবে। দিনের বেলা কর্মব্যস্ত সময়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কর্মদিবসে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত খনন ও নির্মাণকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেশি জনবল ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে একটানা ২৪ ঘণ্টা কাজ চালিয়ে দ্রুত শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি কাজের ঠিকাদার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ডিএমপির দেওয়া কাজের ট্র্যাক রেকর্ড প্রতিবেদনকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যেসব উন্নয়ন প্রকল্পে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু প্রকল্প এলাকার নিজস্ব করিডোর নয়, বরং পুরো ঢাকা মহানগরের সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। পাশাপাশি একাধিক বিকল্প ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা নির্বাচন করতে হবে।
এরপর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ডাইভারশন পরিকল্পনা তৈরি করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। নির্মাণস্থলে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি সাইটে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষিত ট্রাফিক সিগন্যালম্যান মোতায়েন রাখতে হবে। নির্মাণস্থলের উভয় পাশে অন্তত ৫ থেকে ৬ ফুট উচ্চতার কংক্রিট বা স্টিলের মজবুত ব্যারিকেড নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সচল লেন বা পথচারীদের ফুটপাতে নির্মাণসামগ্রী, বালুর স্তূপ কিংবা ভারী যন্ত্রপাতি রাখা যাবে না। জরুরি পরিস্থিতির জন্য নির্মাণস্থলে পানির ট্যাংক, অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার এবং ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের জরুরি ফোন নম্বরসংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। কাজ শুরুর পূর্বে মাইকিং বা প্রচারপত্র বিলির মাধ্যমে এলাকাবাসীকে সার্বিক বিষয় সম্পর্কে আগাম জানাতে হবে।
যথাযথ নির্মাণসামগ্রী প্রস্তুত না রেখে শুধু রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন জনপথ ফেলে রাখা যাবে না। এমনটি ঘটলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দায়িত্বরত ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্মাণকাজের কারণে বিকল্প সড়কে ছোটখাটো খানাখন্দ তৈরি হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিমানবন্দর ফ্লাইওভার সংলগ্ন সড়কের পাশে জমে থাকা মাটি ও পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী দ্রুত সরিয়ে ফেলে রাস্তাটি সম্পূর্ণ সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় রাস্তা বন্ধ থাকার সঠিক কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত জনসাধারণের অবাধ চলাচলের পথ উন্মুক্ত করতে বলা হয়েছে।
উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ও নাগরিক দুর্ভোগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে প্রতি মাসে একটি যৌথ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের (ট্রাফিক) সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট সব উন্নয়ন সংস্থা ও ঠিকাদার প্রতিনিধিদের নিয়ে এই পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ ড্রোন বা সরেজমিন পরিদর্শন থেকে প্রাপ্ত যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকির সচিত্র প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে। পাবলিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে স্কুল-কলেজ সংলগ্ন সড়ক ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় তীব্র ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি ছিটানো এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। রাজধানীর যাবতীয় উন্নয়নকাজে সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতা কাটাতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন