তানভীর হাসান তানু
অক্টোবর ৫, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
ছবি: দিনাজপুর টিভি
অনুকূল আবহাওয়া আর উপযুক্ত মাটির কারণে প্রতিবছরই ব্যাপক পরিসরে আলুর আবাদ হয় উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। তবে হিমাগারে সংরক্ষিত সেই আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। হিমাগার ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে খরচ দাঁড়িয়েছে ১৯ থেকে ২০ টাকা। অথচ পাইকারি বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১৪ টাকা কেজি দরে। ফলে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
চাহিদা কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু খালাসের গতি নেমে এসেছে তলানিতে। গত মৌসুমে জেলায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অনুকূল পরিবেশের কারণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয় প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলুই চাষ হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার হেক্টরে। মৌসুম চলাকালে মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা প্রতি কেজি আলু ১০ থেকে ১২ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সময় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ভালো দামের প্রত্যাশায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে সেই আলু বিক্রি করতে গিয়ে উল্টো পুঁজি হারানোর উপক্রম হয়েছে। বাজারে সার্বিক চাহিদা কম থাকায় হিমাগারগুলো থেকে প্রত্যাশিত গতিতে আলু বের হচ্ছে না। স্বাভাবিক সময়ে এই মৌসুমে হিমাগারের সিংহভাগ আলু বাজারে চলে আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ আলুই ভেতরে মজুদ রয়ে গেছে। এতে কৃষক, সাধারণ ব্যবসায়ী এবং চুক্তিবদ্ধ বিভিন্ন কোম্পানি একযোগে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারের জরুরি সহযোগিতা দাবি করেছেন প্রান্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
ঠাকুরগাঁও জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য রয়েছে মোট ১৯টি হিমাগার। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এসব হিমাগারে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন আলু মজুদ রয়েছে। বিপুল পরিমাণ এই মজুদ সময়মতো বাজারে বিক্রি না হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বেন হিমাগার মালিকরাও।
হিমাগার পরিচালনাকারীদের মধ্যেও বাড়ছে গভীর দুশ্চিন্তা। ঠাকুরগাঁওয়ের শাহী হিমাগারের ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন জানান, বাজারে আলুর দরপতন হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সাথে মালিকপক্ষও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। আলু যদি যথাসময়ে খালাস না হয়, তবে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই আর্থিক বিপর্যয়ে পড়বে।
সংকটের প্রভাব সরাসরি ছড়িয়ে পড়েছে হিমাগারের দিনমজুর ও শ্রমিকদের জীবনেও। আলু ওঠানো ও নামানোর কাজের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় মারাত্মকভাবে কমে গেছে তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার। ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আলমগীর কবির জানান, কৃষকরা বাড়তি লাভের প্রত্যাশায় কষ্টার্জিত আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসেও বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে অবিক্রীত থেকে যাওয়ার স্পষ্ট আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চরম এই আর্থিক বিপর্যয় ঠেকাতে এবং বাজার স্বাভাবিক করতে দ্রুত বিদেশে আলু রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।