অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১১:৫১ পিএম
বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত রূপান্তরের লক্ষ্যে মোংলা বন্দরে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে বাংলাদেশকে ৩৪ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে চীন। চীনা মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪০ কোটি আরএমবি এবং বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাথে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মধ্যে এই ঋণ সহায়তা প্রদানের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সোমবার (১২ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের গৃহীত ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আলিয়া মেহের এবং চীন এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফেংজুন থিয়ান এই ঋণ চুক্তিতে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চীন সরকার এই প্রকল্পের জন্য বার্ষিক ২ শতাংশ নমনীয় সুদে ঋণ সরবরাহ করবে।
ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ধরা হয়েছে মোট ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর থাকবে রেয়াতকাল বা গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে।
এই প্রকল্পের আওতায় মোংলা বন্দরে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের পাশাপাশি দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল, আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড এবং ভারী কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে, যা সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ধাপে উন্নীত করবে।
ঐতিহাসিকভাবে মোংলা বন্দরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালে।
প্রথমে খুলনা জেলার চালনা অঞ্চলে বন্দরটির প্রাথমিক কার্যক্রম চালু হলেও ভৌগোলিক পারিপার্শ্বিকতার কারণে প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় পুরো কার্যক্রম বর্তমান বাগেরহাটের মোংলায় স্থানান্তর করা হয়। ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজ ‘দ্য সিটি অব লিয়নস’-এর নোঙর ফেলার মধ্য দিয়েই বন্দরটির সমুদ্র বাণিজ্যের সূচনা ঘটেছিল। বর্তমানে সীমিত পরিসরে কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানোর অবকাঠামো থাকলেও পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কপথে দ্রুত যোগাযোগের কারণে বন্দরটিতে আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশের প্রধান সমুদ্র বাণিজ্যের সিংহভাগ এখনো চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই পরিচালিত হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রপথে পরিচালিত কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে চট্টগ্রাম বন্দর, যেখানে মোংলার বর্তমান অংশ মাত্র ১ শতাংশ।
তবে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক বার্ষিক পরিসংখ্যানে কার্যক্রমের স্পষ্ট প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৯৮৭টি বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর করে এবং ৯৯৪টি জাহাজ পণ্য খালাস বা বোঝাই শেষে বন্দর ছেড়ে যায়। আগমনকারী এসব জাহাজের মধ্যে ৪৭টি ছিল কনটেইনারবাহী জাহাজ, যার মাধ্যমে মোট ২৯ হাজার ৭১৪টি কনটেইনার পণ্য ওঠানামা করা হয়। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে মোংলায় ৮ হাজার ২৫৮টি কনটেইনার বেশি হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়েছে।
কনটেইনার পণ্যের পাশাপাশি আমদানি করা মোটরগাড়ি খালাসেও ভূমিকা রাখছে মোংলা বন্দর। গত অর্থবছরে বন্দরটি দিয়ে ১২ হাজার ৭৫টি আমদানি করা গাড়ি সফলভাবে খালাস করা হয়, যা তার আগের অর্থবছরের ১১ হাজার ৫৭৯টি গাড়ির তুলনায় বেশি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই বন্দরটি দিয়ে ৩ হাজার ৬৪৩টি আমদানি করা গাড়ি খালাস সম্পন্ন হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন