অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় আবহমান গ্রামবাংলার দুইশত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তিন দিনব্যাপী নৌকা বাইচ উৎসব বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় শুরু হয়েছে। উপজেলার কলাবাড়ি ইউনিয়নের কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত বিল বাঘিয়ার বাবুর খালের দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই বর্ণাঢ্য আয়োজনকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের মিলনমেলা বসেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন নৌকার এই তুমুল প্রতিযোগিতা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
স্থানীয়দের কাছে এটি মূলত `বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ` নামে পরিচিত। দুই শতাব্দীর পুরনো এই আয়োজনে গোপালগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামের নানা ধরনের দৃষ্টিনন্দন নৌকা অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা, চিলাকাটা ও জয়নগর বাচারী নৌকা।
বাইচের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে জমে উঠেছে নৌকায় নৌকায় ভাসমান মেলা।
খালের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ হাজার হাজার দর্শনার্থী দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করেন। ঢোল-কাঁশির বাদ্যের তাল, জারি-সারি গানের সুর আর মাঝি-মাল্লাদের সম্মিলিত `হেঁইও হেঁইও` ধ্বনির সাথে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে পুরো চরাঞ্চলে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। খালের পাড় থেকে দর্শকদের অবিরাম করতালি ও হর্ষধ্বনি মাল্লাদের ক্ষিপ্র গতিতে নৌকা চালাতে উৎসাহ জোগায়।
উৎসবের সময়সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনেও দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এরপর বুধবার (২৮ অক্টোবর) শেষ দিনে একই সময়ে সমাপনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে তিন দিনের এই জমজমাট মিলনমেলার।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এর পেছনে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজক কমিটি কিংবা বিজয়ীদের জন্য কোনো পুরস্কারের ব্যবস্থা।
মাঝি-মাল্লারা সম্পূর্ণ নিজস্ব তাগিদে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৌকা নিয়ে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। কোটালীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বশার হাওলাদার বলেন, শৈশব থেকেই তিনি এই ঐতিহ্য দেখে আসছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক কমিটি বা পুরস্কারের ঘোষণা ছাড়াই দুইশত বছর ধরে মানুষ এই উৎসব টিকিয়ে রেখেছে। সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাইচ দেখতে আসা শিক্ষার্থী অনন্যা হালদার, প্রিয়ন্তি রায় পিউ এবং গৃহবধূ জ্যোৎস্না অধিকারী জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌকা বাইচ দেখার অভিজ্ঞতা থাকলেও এখানকার মতো বিশাল ও রাজকীয় আয়োজন তাদের চোখে অনন্য।
কোটালীপাড়ার নৈয়ারবাড়ি গ্রামের প্রবীণ বাইচার সুকমল সরকার জানান, বংশপরম্পরায় দর্শনার্থীদের আনন্দ দিতে এবং নিজেরা আনন্দ উপভোগ করতে তারা এতে যোগ দেন। তাদের পূর্বপুরুষদের শুরু করা এই ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মও টিকিয়ে রাখবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে মূল বিলে এই বাইচ হলেও নাব্যতা সংকটের কারণে এখন খালে আয়োজন করতে হচ্ছে। ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনি দ্রুত বাবুর খাল সংরক্ষণের দাবি জানান।
কলাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট বিজন বিশ্বাস জানান, নদীমাতৃক এই জনপদের দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী বাঘিয়া বিলের নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আবহমান গ্রামবাংলার অতি প্রাচীন এই কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও নিজস্বতাকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানান তিনি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন