মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

চিরিরবন্দরে স্ত্রী ও দুই শিশুকে হত্যার অভিযোগ: স্বামীসহ আটক ৩

এনামুল মবিন(সবুজ)

অক্টোবর ২০, ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

চিরিরবন্দরে স্ত্রী ও দুই শিশুকে হত্যার অভিযোগ: স্বামীসহ আটক ৩

ছবি: দিনাজপুর টিভি

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে স্বামী শাকিল হোসেন (২৬), শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন (৫৫) ও শাশুড়ি রহমত আরা তারাবিবিকে (৪৫) আটক করেছে পুলিশ। রোববার (১৮ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটায় ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরদিন সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ (দিমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। এর আগে রোববার দিবাগত রাত বারোটার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়।

এ ঘটনায় নিহত গৃহবধূর পিতা খাইরুল ইসলাম বাদী হয়ে সোমবার দুপুর বারোটায় চিরিরবন্দর থানায় তিনজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলাটি এজাহারভুক্ত করেছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. আনোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আব্দুল হালিম, চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুন নবী, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন এবং জেলা সিআইডির পুলিশ সুপার ও পরিদর্শকসহ ক্রাইমসিন ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা। তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চিরিরবন্দরের মোস্তফাপুর বালুপাড়ার মাহাতাব উদ্দিনের ছেলে অটোচালক শাকিল হোসেনের সঙ্গে পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী এলাকার খাইরুল ইসলামের মেয়ে স্বর্ণা বেগমের (২০) সাড়ে তিন বছর আগে প্রেমের সম্পর্কে বিয়ে হয়। এই দম্পতির সাফায়াত হোসেন (২) নামে এক ছেলে ও রাইফা জুরাইনা (১) নামে এক মেয়ে ছিল। ঘটনার রাতে ঘরের বিছানায় দুই শিশুর নিথর দেহ পড়ে ছিল এবং মেঝেতে শোয়ানো অবস্থায় ছিল গৃহবধূর মরদেহ।

অভিযোগ রয়েছে, শাকিলের মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার কারণে পরিবারটিতে প্রায়ই কলহ হতো। অভাবের কারণে শাকিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন এবং গভীর রাতে বাড়ি ফিরতেন।

নিহত গৃহবধূর শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন বলেন, অন্যের জমিতে দিনমজুরির কাজ শেষে সন্ধ্যার পরপরই তিনি বাড়ি ফেরেন। রাতে ভাত খাওয়ার সময় পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ডাকাডাকি করেন। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি টিনের বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুত্রবধূর মরদেহ দেখতে পান। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন এবং তার স্ত্রী দুই নাতি-নাতনিকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

নিহত গৃহবধূর মা আনজু আরা বলেন, জামাতা শাকিল মুঠোফোনে তাদের জানান যে তাদের মেয়ে দুই সন্তানকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করেছে। এই খবর পেয়ে তারা দ্রুত ছুটে আসেন। তিনি আরও জানান, তিন মাস আগে তাঁর মেয়ে জামাতার মাদকাসক্তির কথা জানিয়েছিল।

গৃহবধূর বড় ভাই ও অভিযুক্ত শাকিলের ভগ্নিপতি শাহানুর সজীব বলেন, বিয়ের পর তিনি ছয় বছর একই বাড়িতে লাগোয়া ঘরে বাস করেছেন। বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত থাকলেও ছুটিতে এসে গত শনিবার ওই বাড়িতেই ছিলেন। তিনি জানান, এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তা তারা বুঝতে পারছেন না।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুর আমিন শাহ বলেন, প্রকাশ্যে কোনো পারিবারিক কলহ বা অভিযোগ ছিল না। তবে ঘরের দেয়ালে একটি লেখা পাওয়া গেছে, যেখানে লেখা ছিল: ‍‍`আজ থেকে এ গল্প শেষ। আমি অভাগি মা। আমার সন্তানদের নিজে মারছি। সন্তানদের পুলিশের কাছে দিয়েন না। লাশ পলাশবাড়িতে মাটি দেন। শাকিল যেন না ছোয়, বাবা মা সরি।‍‍` লেখার নিচে ভালোবাসার চিহ্ন আঁকা ছিল। তবে এই লেখাটি কার, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জেলা পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও মোটিভ উদঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সুরতহাল শেষে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তিনজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুন নবী জানান, নিহতের পিতার এজাহার গ্রহণ করে মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বামী শাকিল নিজেই স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেছে। ঘটনার পেছনের মূল কারণ উদঘাটনে অধিকতর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।