বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বিপ্লব

রোবট ও চালকবিহীন গাড়িতে চিপের বড় বাজার দেখছে মাইক্রন

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

রোবট ও চালকবিহীন গাড়িতে চিপের বড় বাজার দেখছে মাইক্রন

মানুষের মতো দেখতে রোবট এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজে চলতে সক্ষম গাড়ি—এই দুই উদীয়মান প্রযুক্তিতে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রসারে ক্লাউড ডেটা সেন্টারগুলোতে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির তৈরি আধুনিক চিপের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি হতে যাচ্ছে আমাদের চারপাশের বাস্তব ভৌগোলিক জগতে। একদিকে চালক ছাড়া গাড়ি নিজে চলবে, অন্যদিকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নানা ধরনের শারীরিক ও দৈনন্দিন কাজ করবে উন্নত রোবট। এসব জটিল যন্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় যান সচল রাখতে প্রয়োজন হবে বিপুল তথ্য। সেই বিশাল ডেটা সংরক্ষণ ও দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের মেমোরি চিপ সরবরাহে ব্যবসা সম্প্রসারণের পথ খুঁজছে মাইক্রন।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও ব্যবসা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইয়াহু ফাইন্যান্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি চড়তি প্রান্তিকের আর্থিক আয় প্রকাশের পর আয় সংক্রান্ত পর্যালোচনায় অংশ নিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেন মাইক্রনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় মেহরোত্রা। তিনি জানান, তাদের বাণিজ্যিক দৃষ্টি এখন পুরোপুরি নিবদ্ধ স্বয়ংক্রিয় চালকবিহীন গাড়ি এবং মানবাকৃতির বা হিউম্যানয়েড রোবটের বাজারের দিকে।

বর্তমানে ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি কিংবা অ্যানথ্রপিকের ক্লডের মতো শীর্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো সচল রাখতে ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোতে মাইক্রনের মেমোরি ও তথ্য সংরক্ষণের চিপ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বর্ধিত চাহিদা ইতিমধ্যে কোম্পানির আর্থিক মুনাফা বাড়াতে এবং শেয়ার বাজারে শেয়ারের দাম বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।

মাইক্রনের শীর্ষ কর্মকর্তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাস্তব পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রথম বড় বাণিজ্যিক প্রয়োগ ঘটতে যাচ্ছে চালকবিহীন গাড়ির মাধ্যমে। আর সময়ের বিবর্তনে এই প্রযুক্তির বিস্তার ছড়িয়ে পড়বে মানবাকৃতির রোবটেও। চারপাশের পরিবেশ সঠিকভাবে স্ক্যান করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো জটিল কাজের জন্য এসব স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে মেমোরি এবং তথ্য জমা রাখার ধারণক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়াতে হবে।

একটি গাড়ি কতটা নিজে চলতে পারে, তা আন্তর্জাতিকভাবে পরিমাপ করতে শূন্য থেকে পাঁচ পর্যন্ত মোট ছয়টি সুনির্দিষ্ট ধাপ নির্ধারণ করেছে গাড়ি প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন সোসাইটি অব অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স। এর মধ্যে শূন্য ধাপে চালকের জন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় সহায়তা থাকে না, আর পাঁচ নম্বর ধাপে পৌঁছালে গাড়ি কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই শতভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম হয়।

মাইক্রন প্রধানের দেওয়া হিসাব মতে, চার নম্বর বা তার ওপরের ধাপের সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে সাধারণত ২০০ গিগাবাইটের চেয়েও বেশি মেমোরি চিপ প্রয়োজন হয়। একই সাথে তাৎক্ষণিক তথ্য সংরক্ষণের চাহিদা গিয়ে ঠেকে একাধিক টেরাবাইটে। বর্তমানে বাজারে প্রচলিত দুই ও তিন নম্বর ধাপের আধা-স্বয়ংক্রিয় গাড়ির তুলনায় এই মেমোরি ব্যবহারের হার অন্তত ১০ গুণ বেশি। মূলত দ্রুততম সময়ে আশপাশের রাস্তাঘাটের সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বার্থেই গাড়িতে এত বিপুল চিপের সংযোগ ঘটাতে হচ্ছে।

একইভাবে মানবাকৃতির রোবটের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি ও দ্রুত তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে, যা মাইক্রনের বাণিজ্যিক পরিধিকে আরও সম্প্রসারিত করবে।এই সম্ভাবনাময় বাজার দখলে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ইলন মাস্কের টেসলা ও ফিগারের পাশাপাশি মানবাকৃতির রোবট তৈরি করছে হুন্দাইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বোস্টন ডায়নামিক্স। এছাড়া এই খাতের দৌড়ে সক্রিয় রয়েছে ইউনিভ্রি রোবটিক্স এবং এজিলিটি রোবটিক্স। প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হলেও বাণিজ্যিকভাবে রোবটের সার্বিক বিক্রি এখনো বড় কোনো পরিসরে পৌঁছায়নি।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে শিল্প ও পেশাদার সেবামূলক কার্যক্রমের জন্য মাত্র সাত হাজার মানবাকৃতির রোবট বিক্রি হয়েছিল। ফলে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার সাথে সাথে একটি বিস্তৃত বাণিজ্যিক বাজার গঠনের জন্য এখনও কিছুটা অপেক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সঞ্জয় মেহরোত্রার দৃঢ় প্রত্যাশা, চলতি দশকের শেষ নাগাদ স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এবং আধুনিক রোবটই বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের চাহিদার মূল চালিকাশক্তিতে রূপ নেবে।